(গভীর রাত। দেওয়াল ঘড়িতে টং... টং... টং... দশটা। দূরে ট্রেনের হুইসেল। জানলার কাঁচে শিউলি গাছের ছায়া নড়ে ওঠে। রাত্রি খাতা দেখতে দেখতে ক্লান্ত চোখে চশমা খুলে রাখে। ঘর নিস্তব্ধ।)

মোবাইল রিং।
রাত্রি: (ক্লান্ত গলায়) হ্যালো...

(ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা)

বিপ্লব: হ্যালো... এটা কি রাত্রি মুখার্জীর নম্বর?

রাত্রি: হ্যাঁ ... বলছি। আপনি?

বিপ্লব: আমি, আমি বিপ্লব সরকার।

রাত্রি: দুঃখিত, চিনতে পারলাম না।

বিপ্লব: চিনতে পারার কথাও নয়।
(নীরবতা)

বিপ্লব: আসলে... ফোনটা পঁচিশ বছর আগে করা উচিত ছিল।
রাত্রি: (অবাক) কী বললেন?

বিপ্লব: দেরি হয়ে গেছে।
অনেক দেরি।

রাত্রি: আপনি আসলে কে?কি বলতে চাইছেন?

বিপ্লব: একটা পুরোনো গল্পের শেষ সাক্ষী।যে গল্পটা আপনাকে না বললে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে গল্পটা।
(নীরবতা)

রাত্রি: আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

বিপ্লব: না, বোঝার কথাও নয়, আসলে একটা মানুষের কথা আপনাকে না বললেই নয়।

রাত্রি: কার কথা বলছেন,বলুন।

বিপ্লব: বিহান।বিহান সরকার।

(হঠাৎ সমস্ত শব্দ যেন থেমে যায়। শুধু ঘড়ির টিকটিক।)

রাত্রি: (অত্যন্ত আস্তে) ...বিহান? কেন, কি হয়েছে বিহানের, বলুন...

( নেপথ্যে ---
মানুষ বয়স বাড়লে অনেক কিছু ভুলে যায়।
কিন্তু কিছু নাম ভুলে যায় না।
সেই নামগুলো বুকের ভেতর পুরনো ক্ষতের মতো থেকে যায়।
ছুঁলেই ব্যথা হয়।)

রাত্রি: আপনি... আপনি..ওকে চিনতেন?

বিপ্লব: শুধু চিনতাম না।
ওর কান্নাও জানতাম।
ওর হাসিও জানতাম।
আর জানতাম... একটা নাম.. কতবার যে ঐ নাম ওর মুখে শুনেছি..

আপনার নামটা শুনলে ওর চোখ কেন অন্যরকম হয়ে যেত।

রাত্রি: (কাঁপা গলায়)
ও... ও.. এখন কেমন আছে?কোথায় আছে ও?

(কিছু সময় নীরবতা)

বিপ্লব: সেই জানাতেই ফোন করেছি।যদিও অনেক আগেই ফোনটা করা উচিত ছিল।


রাত্রি: এতদিন পর?

বিপ্লব: কারণ এতদিন সাহস ছিল না। আর একটা ডাইরি হঠাৎ আমার সাহসটা বাড়িয়ে দিল।

রাত্রি: আর আজ হলো?

বিপ্লব: আজ না বললে আর কোনোদিন বলা হতো না।

রাত্রি: কী হয়েছে?
বিপ্লব: বিহান, বিহান আজ আর নেই।

(দীর্ঘ স্তব্ধতা দূরে কুকুরের ডাক।
ঘড়ির টিকটিক।)

রাত্রি: (ফিসফিস করে)
না...
না...
না...
আপনি ভুল করছেন...মিথ্যে বলছেন, বলুন..

বিপ্লব:( গলা ধরে আসে )
সত্যি খুব চাইছি ভুল হোক, সত্যি ভুল হোক, ভুল হলে সত্যি আমার চেয়ে আর কেউ খুশি হত না কিন্তু সেটা যে আর হবার নয়।

( নেপথ্যে ---
পৃথিবীতে কিছু খবর শব্দ করে আসে না।
চুপচাপ এসে মানুষের ভেতরটা ফাঁকা করে দিয়ে যায়।)

রাত্রি: কবে?কি হয়েছিল ওর?

বিপ্লব: তিন মাস আগে।

রাত্রি: ...আর আজ আমাকে জানাচ্ছেন আপনি?

বিপ্লব: কারণ একটা ডায়েরিটা আজ খুঁজে পেয়েছি
সেখানে আপনার নাম ছিল।ফোন নম্বর ছিল, শুধু আপনার নাম, কত ভাবে যে সে নামের প্রতি ভালোবাসা আবেগ ওতে জড়িয়ে ছিল, তা না পড়লে বুঝতেই পারতাম না
শেষ পাতা পর্যন্ত ঐ একটি নাম -- রাত্রি..


রাত্রি: এখনও?ভাবতে পারছি না আর..

বিপ্লব: শুধু নাম না।
একটা জীবন ছিল।
একটা অপেক্ষা ছিল।

রাত্রি: (নিজের সঙ্গে)
পঁচিশ বছর...
পঁচিশ বছর পরে কেউ আবার আমার সামনে ওর নাম বলছে...

বিপ্লব: জানেন...
ডায়েরির একটা পাতায় লেখা ছিল...
"ভালোবাসা সবসময় হয়তো প্রিয় মানুষকে কাছে এনে দেয় না, অনেক সময় দূরেও সরিয়ে দেয়। ভাগ্যহীনদের জন্য অপেক্ষা করে শুধু অপেক্ষা।
এর মধ্য দিয়েই কখনও কখনও সারাজীবন কেউ হয়তো আগলে রাখে প্রিয়জনকে হৃদয় জুড়ে।

(ফ্ল্যাশব্যাক:----
কলেজ ক্যান্টিন। হাসি। চায়ের কাপের শব্দ।)


বিহান: রাত্রি, তুমি বুড়ো হলে কেমন দেখাবে?

রাত্রি: (হাসি) এইসব প্রশ্ন করছ কেন?পাগল!

বিহান: কারণ আমি দেখতে চাই।

রাত্রি: তার জন্য এতদিন বাঁচতে হবে।

বিহান: বেঁচে থাকব।
তোমার পাশে থাকলে বাঁচা খুব কঠিন হবে না।

রাত্রি: (হাসতে হাসতে)আজকাল
সিনেমাটা বেশি দেখছো, পাগল কোথাকার..

বিহান: সে তো ঠিক, পাগল বলেই না তোমার বিশ্বাস নিয়েই বেঁচে থাকবো।

(বর্তমান)

রাত্রি: (ভাঙা হাসি)
ছেলেটা এমনই ছিল...
স্বপ্ন দেখতে জানত।

বিপ্লব: আর আপনাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে সবচেয়ে বেশি জানত।ওর স্বপ্ন জুড়েই একটি মানুষ...
একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

রাত্রি: করুন।

বিপ্লব: আপনি বিয়ে করেননি কেন?
(নীরবতা)
রাত্রি: কেন জানি না।কোন উত্তর নেই এর..
হয়তো অপেক্ষা করছিলাম।
হয়তো নিজেকেই বোঝাতাম অপেক্ষা করছি না।

বিপ্লব: বিহানও করেনি।

রাত্রি: (স্তম্ভিত)
কি বলছেন

বিপ্লব: হ্যাঁ ঠিক বলছি,কাউকে বিয়ে করেনি।আর
কাউকে ভালোবাসেওনি।

রাত্রি: কিন্তু ও তো...

বিপ্লব: হ্যাঁ,ওর বাড়ি থেকে বিয়ে ঠিক হয়েছিল।
রাজি হয়নি।
আপনার বিয়ে হয়ে গেছে শুনে সরে গিয়েছিল।

রাত্রি: (কান্নাভেজা হাসি)
জানেন?
আমার জীবনটা কী হাস্যকর!
আমি ভেবেছি ও আমাকে ভুলে গেছে।
ও ভেবেছে আমি ওকে ভুলে গেছি।

বিপ্লব: সমাজের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি জানেন কী?

রাত্রি: কী?

বিপ্লব: মানুষ বিচ্ছেদে হারায় কম।
ভুল বোঝাবুঝিতে হারায় বেশি।

রাত্রি: শেষ দিকে ও খুব কষ্ট পেয়েছিল?তাই না!

বিপ্লব: শরীরের কষ্ট যতটা ছিল...
মনের কষ্ট তার চেয়ে বেশি।

রাত্রি: আমার কথা বলত?
বিপ্লব: খুব কম।

রাত্রি: তাহলে?

বিপ্লব: যারা সত্যিই ভালোবাসে...
তারা নাম উচ্চারণ করে কম।
বুকে বহন করে বেশি।যাপন করে অনেক বেশি।
একদিন বলছিল...
"জানিস, পৃথিবীর সবথেকে নিষ্ঠুর শব্দ কী?"
আমি বললাম কী?
ও বলল...
"পরে।"

রাত্রি: মানে?

বিপ্লব: "পরে ফোন করব।
পরে বলব।
পরে দেখা হবে।
এই 'পরে' শব্দটার ভেতরেই কত জীবন শেষ হয়ে যায়।"

( নেপথ্যে:---
এই গল্পে কোনো খলনায়ক নেই।
কেউ প্রতারণা করেনি।
কেউ কাউকে ঠকায়নি।
তবুও দুটি জীবন নষ্ট হয়েছে।
কারণ সমাজ তাদের কথা বলতে শেখায়নি।
মেয়েটাকে শেখানো হয়েছিল সহ্য করতে।
ছেলেটাকে শেখানো হয়েছিল কাঁদতে নেই।
দু'জনকেই শেখানো হয়েছিল...
"লোক কী বলবে।")

রাত্রি: আমরা যদি একবার কথা বলতাম...হয়তো..

বিপ্লব: তাহলে আজকের ফোনটা হয়তো কোনোদিন নাও আসতে পারত।
মৃত্যুর আগের রাতে ও একটা কথা বলেছিল।

রাত্রি: কী?

বিপ্লব: "রাত্রি কি এখনও রাত জাগে?"

(রাত্রির কান্না)

বিপ্লব: তারপর বলেছিল...
"ওকে বলিস...
আমি ওর ওপর কোনোদিন রাগ করিনি।
শুধু খুব মিস করেছি।"

রাত্রি: ডায়েরিটা...
আমার কাছে আনবেন?

বিপ্লব: নিশ্চয়ই।

রাত্রি: হয়তো কিছু উত্তরের এখনও দেরি হয়নি।হয়তো,হয়তো আমার সমস্ত অপেক্ষা দিয়ে ওকে যদি একবার ফিরে পেতাম...যদি একটিবার....হ্যালো, হ্যালো... বিপ্লব বাবু......


( নেপথ্যে :----- রাত তখন আরও গভীর।
ফোন কেটে গেছে।
কিন্তু রাত্রি মুখার্জীর ঘরে আলো জ্বলছে।
কোলের ওপর বিহানের ডায়েরি।
শেষ পাতায় কাঁপা হাতে লেখা একটাই বাক্য...
"আমাদের ভালোবাসা হেরে যায়নি।
হেরে গিয়েছিল আমাদের নীরবতা।"

যদি আপনার জীবনেও এমন কেউ থাকে...
যার নাম শুনলে আজও বুক কেঁপে ওঠে...
তাহলে অপেক্ষা করবেন না।
একটা ফোন করুন।
একটা বার্তা পাঠান।
একবার বলুন...
"তুমি কেমন আছো?"
কারণ মৃত্যু অনেক সম্পর্ক শেষ করে।
কিন্তু অহংকার...
অসংখ্য সম্পর্ককে মৃত্যুর আগেই মেরে ফেলে।)

ঘড়িতে রাত বারোটার ঘণ্টা।
তারপর ধীরে ধীরে বৃষ্টির শব্দ।
নীরবতা।
সমাপ্ত।