গ্রন্থাগার
শংকর ব্রহ্ম

আমার চোখে গ্রন্থাগার এক চরম বিস্ময়।
গ্রন্থাগারে ঢুকে মনেহয়, অমর মনীষীরা সব ঘুম থেকে জেগে উঠে যেন, সকলেই একসঙ্গে আমার সাথে কথা বলতে চায়। কী বিস্ময় ! কী বিস্ময় !
একবার তাদের সঙ্গ নিলে কারও, আনন্দ যাপনে যে কোথা থেকে সময় ফুরায়, বোঝা দায়। তখন মৃত্যুও যেন তুচ্ছ মনেহয়।

জ্ঞান সংরক্ষণ এবং জ্ঞানের প্রসার এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সরবরাহ রাখে গ্রন্থাগার, যা মানব সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছে। সভ্যতার অগ্রগতিতে মানুষের নির্ভরযোগ্য এক সঙ্গী গ্রন্থাগার। যারা বই পড়তে ভালোবাসেন, তারা জানেন লাইব্রেরি হলো জ্ঞানের ঘর।

'সংসদ্ বাংলা অভিধান'-এর মতে, গ্রন্থাগার (গ্রন্থ+আগার) মানে যে গৃহে নির্দিষ্ট পাঠকের জন্য বহু গ্রন্থ সাজাইয়া রাখা হয়।

গ্রন্থাগারের ইংরেজি প্রতিশব্দ ’Library’. Library শব্দের উৎপত্তি হয়েছে মূলত ল্যাটিন শব্দ ’Liber’ থেকে। Liber শব্দটি থেকে এসেছে Librarium শব্দটি থেকে, যার অর্থ ’বই রাখার স্থান’। এর থেকে উদ্ভূত হয়েছে ফরাসি শব্দ librairie, যার অর্থ ’বইয়ের সংগ্রহ’, এখান থেকে অ্যাংলো ফ্রেঞ্চ শব্দ librarie এবং সব শেষে ইংরেজি Library শব্দটি এসেছে।
গ্রন্থাগার বলতে সাধারণত বোঝায় যেখানে তথ্য সামগ্রী সংগ্রহ করা হয়, সংরক্ষণ করা হয় এবং চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত পাঠককে সরবরাহ করা হয়। তাই বলা যায়, গ্রন্থাগার একটি জীবন্ত উপকরণ, যা অতীতের সমস্ত তথ্য সংরক্ষণ করে রাখে যাতে বর্তমান প্রজন্মের জন্য। এটা এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা অতীত এবং বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে সেতুবন্ধন করে এবং তাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে যা তথ্য সমূহের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ব্যবহার করার জন্য উপযোগী করে তোলে।
ইউনিস্কো-এর মতে,লাইব্ররীর সংজ্ঞা ”মুদ্রিত বই, সাময়িকী অথবা অন্য যে কোন চিত্রসমৃদ্ধ বা শ্রবণ-দর্শন সামগ্রীর সংগঠিত সংগ্রহশালা হল গ্রন্থাগার। যেখানে পাঠকের তথ্য, গবেষণা, শিক্ষা অথবা বিনোদন চাহিদা মেটানোর কাজে সহায়তা করা হয়।”
”গ্রন্থাগার হলো এমন একটি সংগঠন যেখানে বই, পত্র পত্রিকাও সমজাতীয় উপকরণ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করা হয়।”

গ্রন্থাগার নানা প্রকারের হয়ে থাকে। সাধারনতঃ প্রতিষ্ঠানিকভাবে গ্রন্থাগারকে চার ভাগে ভাগ করা যায়।

১। জাতীয় গ্রন্থাগার
২। গণগ্রন্থাগার
৩। একাডেমিক গ্রন্থাগার
৪। বিশেষ গ্রন্থাগার।

১).
জাতীয় গ্রন্থাগার : জাতীয় গ্রন্থাগার সাধারণত দেশের সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। অন্যান্য গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার পেছনে যে সকল কারণ বিদ্যমান, এ ক্ষেত্রেও তার সবগুলি কারণ বিদ্যমান। তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়। আর এটি হয় এ'জন্য যে, জাতীয় পর্যায়ের গ্রন্থাগার অন্য আর দশটি অনুরূপ প্রতিষ্ঠান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এটি একটি নন-লেন্ডিং প্রতিষ্ঠান। মূলত : জাতীয় গ্রন্থাগার এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার সংগ্রহের পরিধি জাতীয় ভিত্তিক, গুরুত্ব আন্তর্জাতিক এবং দেশ ও জাতি সম্পর্কে দেশী-বিদেশী সকল প্রকাশনা সংগ্রহ করে জাতীয় ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করাই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

২).
গণগ্রন্থাগার : পাবলিক লাইব্রেরি বা গণগ্রন্থাগার জনগণের বিশ্ববিদ্যালয়। সমাজের সকল স্তরের লোকের চাহিদা পূরণের জন্য এর উৎপত্তি ও বিকাশ। অন্য কোন গ্রন্থাগার এই উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় না। এমনকি এর মতো বহুমুখি সেবা দিতেও পারে না। সমগ্র জাতিকে পরিকল্পিত উপায়ে সাহায্য করা এর লক্ষ্য, বিশেষ করে বুদ্ধির পরিপক্কতা অর্জনে সহায়তা গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে একটি। সমাজে সকল প্রকারের সদস্য ছাত্র, যুবক, বৃদ্ধ, মহিলা ও বিভিন্ন পেশাজীবী যেহেতু এর ব্যবহারকারী সুতরাং আবশ্যিকভাবে সংগ্রহ করা হয়ও বহুমুখী ধারণার গ্রন্থ।

৩).
একাডেমিক গ্রন্থাগার : একাডেমিক গ্রন্থাগার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পাঠ ও গবেষণক প্রয়োজন মেটানোর উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব গ্রন্থাগারে কেবল পাঠ্য ও পাঠ্য সহায়ক উপকরণই থাকে না, পাশাপাশি বিভিন্ন রেফারেন্স সামগ্রীসহ বিভিন্ন বিষয়ের তথ্য উপকরণ সংগৃহীত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে অন্যতম উদ্দেশ্য থাকে গবেষকদের প্রয়োজনীয় পাঠ্য উপকরণ সংগ্রহের মাধ্যমে জ্ঞানচর্চায় এগিয়ে যেতে সহায়তা করা।

৪).
বিশেষ গ্রন্থাগার : বিশেষ গ্রন্থাগার আসলে এক ধরনের গবেষণা গ্রন্থাগার, যাকে আমরা টেকনিক্যাল লাইব্রেরিও বলি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে নানা বিষয়ে গবেষণা কর্মের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। এই গবেষণা কর্মে সহায়তা জোগানোর জন্যই বিশেষ গ্রন্থাগারের আবির্ভাব। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদি নানা বিষয়ে তথ্য উপকরণ সংগ্রহের মাধ্যমে বিশেষ গ্রন্থাগারগুলো সমাজে এক ব্যাতিক্রমী ভূমিকা পালন করে থাকে।

লাইব্রেরি নিয়ে জ্ঞানী গুণী ব্যক্তিরা কি বলেছেন শুনুন -

১).
ধন সম্পদ খুঁজতে আমাকে খুব দূরে যেতে হয় না, প্রতিদিন যখন আমি লাইব্রেরিতে যাই তখন আমি সেখানে অনন্য সব ধন খুজে পাই।
— মাইকেল এম্ব্রি।

২).
লাইব্রেরি এমন একটা জায়গা যেখানে সব সময় বিভিন্ন মতামতের সমাগম ঘটে থাকে।
— ন্যান্সি কুনহার্ডত লজ।

৩).
আপনার অস্ত্র দরকার ? লাউব্রেরিতে চলে যান। পৃথিবীর সেরা অস্ত্রগুলির কারখানা হলো লাইব্রেরি।
— ডক্টর হু (WHO).

৪).
লাইব্রেরি কোনো শৌখিনতার বিষয় নয় বরং এটি একটি মানবিক প্রয়োজনীয়তা।
— হেনরি ওয়ার্ড বিচার।

৫).
লাইব্রেরি হলো বিভিন্ন উদ্ভাবনী চিন্তার জন্ম নেয়ার স্থান এবং এমন একটি জায়গা যেখানে ইতিহাস জীবনের সাথে মিলে মিশে যায়।
— নরমান কাজিনস।

৬).
লাইব্রেরি হলো সম্ভবনার জায়গা, এমন একটি স্থান যেখানে হৃদয় ও পৃথিবী উভয়ের দরজা খুলে গিয়ে উন্মুক্ত হয়।
— রিতা ডোভ।

৭).
আমি আমার কল্পনাতে স্বর্গকে সবসময় লাইব্রেরির মতো করে পেয়েছি।
— জইগে লুইস বরগেস।

৮).
যদি আপনার একটি বাগান ও একটি লাইব্রেরি থাকে তবে আপনার সব কিছু আছে।
— মারকাস টুলিয়াস সিসেরো।

৯).
একটি বই একশটি বন্ধুর সমান.. কিন্তু একজন ভালো বন্ধু পুরো একটি লাইব্রেরির সমান।
— এপিজে আবুল কালাম আজাদ।

১০).
লাইব্রেরি হলো মনের অসুখ সাড়ানোর প্রকৃষ্ট ঔষধের দোকান।
— গ্রিক প্রবাদ।

১১).
লাইব্রেরি এমন একটি জায়গা যেখানে ভালোবাসার মানে এবং ভালোবাসা দুটোই খুঁজে পাওয়া যায়।
— রুডোলফো আনায়া।

১২).
যখন মনে চিন্তা আর সন্দেহ ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাচ্ছো না তখন লাইব্রেরিতে যাও।
— প্রবাদ।

১৩).
জ্ঞান অন্বেষণের জন্য তোমার যে জিনিসটা জানতে হবে তা হলো লাইব্রেরির অবস্থানটা কোথায় তা জানা।
— আলবার্ট আইনস্টাইন।

১৪).
লাইব্রেরি এমন একটি জায়গা যেখানে শুধু জ্ঞান ভাসতে থাকে।
— ম্যারি বার্নেস।

১৫).
লাইব্রেরি হলো একটি স্কুলের হৃদয় যা ছাত্রছাত্রীদের হৃদয় গঠনেও ভূমিকা পালন করে।
— রন ব্লাক।

১৬).
কার্লাইল বলেছেন,
" The true University of these days is a Collection of Books"
( আজকের এই দিনগুলির সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় হ'ল বইয়ের সংগ্রহ।)

১৭).
বিধ্বংসীকারী হিসাবে ক্যালিফ ওমর বলেছেন,
"Burn the Libraries,for their value is in the one Book "
( লাইব্রেরিগুলি পোড়াও, কারণ তাদের সম্মান বইতে রয়েছে।)

১৮).
J. H. Shera এর মতে, “The library is an organization, a system designed to preserve and facilitate the use of graphic records.”
(গ্রন্থাগার হ'ল এমন একটি সংস্থা, গ্রাফিক রেকর্ডগুলির ব্যবহার সংরক্ষণ এবং তার সুবিধার্থে নকশা করা একটি পদ্ধতি।"

১৯).
C. C, Aguolu & I. E. Aguolu এর মতে, ”গ্রন্থাগার হচ্ছে মানুষের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেরে নথিপত্রের সমষ্টি, যেটি নানা ফরম্যাট ও ভাষায় সংগঠন ও ব্যাখ্যা করা হয়। গ্রন্থাগার মানুষের জ্ঞান, বিনোদন ও নান্দনিক উপভোগের নানা চাহিদা পূরণ করে।”

২০).
রবীন্দ্রনাথ লাইব্রেরী সম্পর্কে যা বলেছেন, তা খুব প্রণিধান যোগ্য -
" বাঁধিয়া রাখিতে পারিত যে, সে ঘুমাইয়া পড়া শিশুটির মতো চুপ করিয়া থাকিত, তবে সেই নীরব মহাশব্দের সহিত এই লাইব্রেরির তুলনা হইত। এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে, মানবাত্মার অমর আলোক কালো অক্ষরের শৃঙ্খলে কাগজের কারাগারে বাঁধা পড়িয়া আছে। ইহারা সহসা যদি বিদ্রোহী হইয়া উঠে, নিস্তব্ধতা ভাঙিয়া ফেলে, অক্ষরের বেড়া দগ্ধ করিয়া একবারে বাহির হইয়া আসে! হিমালয়ের মাথার উপরে কঠিন বরফের মধ্যে যেমন কত কত বন্যা বাঁধা আছে, তেমনি এই লাইব্রেরির মধ্যে মানবহৃদয়ের বন্যা কে বাঁধিয়া রাখিয়াছে!"

২১).
লাইব্রেরী
- ডাঃমোঃ ইয়াছিন আরাফাত

"বৃষ্টি পরে রিমঝিম ঝিম
ভাঙ্গা কাচে কাটছে অনুভূতি
লাইব্রেরীর একলা টেবিলটাতে
ভাল হত থাকলে তুমি জুথি।

এইত সবে ঘুরে আমেরিকা
হুমায়ুনের ভ্রমন কাহিনীতে
জলপ্রপাতের মেকি শব্দগুলি
বৃষ্টি ধোয়া হয়ে এখন হাতে।

কাল বিকেলে ঝগড়া হল খুব
রাত্রি ছিল জলবিছুটির মত
বৃষ্টি ধোয়া স্নিগ্ধ সকাল আজ
তবু বুকে হাতড়ে দেখি ক্ষত।

কবিতার উর্দ্ধে তুমি কবেই
তোমার নিঃশাস বুকের খাঁচায় বাজে
ঠোঁটের তারায় তোমার ঠোঁটের স্বাদ
স্পর্শ নাচে দেহের ভাজে ভাজে।

বৃষ্টি ভেজা বকুল ফুলের ঘ্রাণ
জানালার কাঁচ গলিয়ে ডাকে
বৃষ্টি চুমে আমার চোখের জল
খেলছে পামের চিড়ল পাতার ফাঁকে।

আমি বসে একলা মনে ভাবি
ভালবাসা বৃষ্টি হয়ে গেলে
লাইব্রেরীর বইয়ের তাকগুলো
সাজিয়ে দেব তোমার চোখের জলে।

লাইব্রেরীতে একলা আমি খুব
মেঘের বুকে মৃদু বানের ডাক
আমার বুকের লাইব্রেরীতে ভরা
তোমার মুখের মিষ্টি কথার তাক।

এই দুপুরে বৃষ্টি ভিজে সব
স্নিগ্ধ হল, আমি কেবল নই
লাইব্রেরীর শূন্য কুঠুরিতে
একলা আমি শূন্য তাকের বই।"