চারপাশে কোনো দৃশ্যমান প্রাচীর নেই, তবুও এই নিঃসীম খাঁচায় আমি একা, অবরুদ্ধ। অন্ধকার হাতড়ে ফিরি, কোথাও নেই কোনো কূলকিনারা— না কোনো তীরের আভাস, না কোনো মুক্তির মোহনা। এ কি তবে সেই বিস্মৃত বাইশের কোনো এক হিমশীতল রাত? নাকি মহাকালের অন্ধ নিয়মে, এক নির্মম আবর্তে অসময়ের কাঁধে হাত রেখে ফিরে এলো চেনা কোনো বিভীষিকা?
শূন্য রাজপথে প্রতিধ্বনিত হয় ভারী বুটের ছন্দ, কাঁধে উদ্যত বন্দুক চেপে দল বেঁধে চলেছে কিছু ছায়ামূর্তি। অথচ কোথাও তো কোনো কাঁটাতারের ভূগোল নেই, নেই কোনো ভিনদেশি আগ্রাসনের পদচিহ্ন। তবে কেন এই রণসজ্জা? কাদের রক্তবীজ নিধনে এই কেনা বারুদের আস্ফালন? দুরবীন যত দূর চোখ যায় শূন্যতায় মেলে ধরি— দিগন্তজুড়ে কোথাও কোনো সীমানা নেই, শত্রু নেই। শত্রু তবে লুকিয়ে আছে আমাদেরই ভাঙা আয়নায়।
আমরা তো কোনোদিন একে অপরের সহনাগরিক হয়ে উঠতে পারিনি; আমাদের অস্থিমজ্জায় জমে থাকা অবিশ্বাসের যে গভীর খাদ, আজ তা-ই রূপ নিয়েছে এক একটি কাল্পনিক সীমান্তে। তাই দেশরক্ষার নামে সাজানো মহড়া এখন ছড়িয়ে পড়েছে পরিচিত অলিগলিতে, ঘরের চৌকাঠে, এ-পাড়া ও-পাড়ার পারস্পরিক সন্দেহের বিবরে।
আমার ঠিক পাশেই পড়ে আছে এক অচেনা নিথর অবয়ব। মনে হয়, শতাব্দীর সঞ্চিত যত ক্লান্তি, যত বিষাদ আর হাহাকার— সব যেন একাকার হয়ে নেমে এসেছে পৃথিবীর বুক চিরে এই শরীরে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, এক শ্রান্ত বুদ্ধ শুয়ে আছেন পরম নির্বাণে, যার মুখে লেগে আছে অনন্ত করুণার এক ধূসর প্রলেপ। কিন্তু একটু কাছে ঝুঁকলেই খুলে যায় সেই পবিত্রতার মুখোশ— ঐ আত্মত্যাগী ভঙ্গিটার অন্তরালে সন্তর্পণে লুকিয়ে আছে এক সুচতুর সহনাগরিকের ধূর্ত হিসাব, কৌশল আর ভণ্ডামির বিষবাষ্প।
মৃত্যুও এখানে আর সত্য নয়, ক্লান্তিও এখানে এক নিপুণ রাজনৈতিক অভিনয়। আর এই সমস্ত চলমান ভণ্ডামি, সশস্ত্র প্রহসন ও মিথ্যার স্রোতের সামনে আমার কোনো ভূমিকা নেই, কোনো ভাষা নেই— আমি কেবল এক বাকহীন, নিষ্পলক, জিম্মি দর্শক।
~ নন্দ দুলাল মন্ডল
মেদিয়া, উত্তর ২৪ পরগণা।
কবিতা — শূন্যতার পাহারাদার
বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রূপক কবিতা
১০৩
এআই বিশ্লেষণ (মূলভাব)
'শূন্যতার পাহারাদার' গদ্যকবিতায় কবি নন্দ দুলাল মন্ডল মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক অবিশ্বাস, রাজনৈতিক ভণ্ডামি ও নিঃসঙ্গতার এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন। বাহ্যিক কোনো শত্রু না থাকলেও সমাজ ও হৃদয়ের কাল্পনিক সীমান্ত মানুষকে একা ও অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। কবি নিজেকে এক নিরুপায় জিম্মি দর্শক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে মৃত্যু বা ক্লান্তিও অভিনয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।