মানুষটা সেতুর ওপরে দাঁড়িয়েছিল
সে মানব মণ্ডল। দুই দিন রাত সে ঘুমোতে পারেনি।ওর গল্প তোমারও ঘুম পারবে না।
ঘরের এক কোণে তার পুরনো ল্যাপটপটা জ্বলছিল। স্ক্রিনে খোলা ছিল তার নিজের সংবাদপত্রের ১১০ সংখ্যার ফাইল।
কত যত্ন করে নামটা বেছেছিল সে ।কলকাতার সময় কিছু টা সময় হয়েছে।
কত রাত জেগে প্রথম সংখ্যার থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি সংখ্যা প্রতিটি পাতা সাজিয়েছিল নিজের হাতে। সত্যি তো আজ সে সফল নয়।
কিন্তু এখন সেই কাগজের স্তূপের দিকে তাকালেই তার মনে হচ্ছিল—সবকিছু যেন তাকে নিয়ে উপহাস করছে।
টেবিলের ওপর কয়েকটা বকেয়া বিল।
এক পাশে ছাপাখানার হিসাব।
আর মোবাইলের স্ক্রিনে নীলাঞ্জনার শেষ কথাগুলো।
“তুমি নিজের স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতে পারো। আমি আর পারছি না, টাকা জন্য লোক তাগাদা দিচ্ছে, তুমি সুনাম চাও আর আমরা বদনাম হচ্ছি পারছি না আর।”
মানব বারবার ফোনটা হাতে নিচ্ছিল, আবার রেখে দিচ্ছিল।
একবার মনে হল ফোন করবে।
বলবে—
“নীলাঞ্জনা, ফিরে এসো। আমি সব সামলে নেবো।”
পরক্ষণেই তার অহংকার বলল—
“কেন? যে মানুষ তোমাকে ব্যর্থ বলে ছেড়ে চলে গেছে, তার কাছে তুমি আবার হাত পাতবে?”
মানব নিজের মনেই উত্তর দিল,
“কিন্তু সে তো আমার স্ত্রী।”
অন্য একটা কণ্ঠস্বর বলল,
“ছিল।”
শব্দটা যেন বুকের মধ্যে কোথাও ধাক্কা দিল।
মানব চোখ বন্ধ করল।
তার মনে পড়ল বহু বছর আগের নীলাঞ্জনাকে।
সাদামাটা একটা মেয়ে।
পড়াশোনা করার প্রবল ইচ্ছে ছিল, কিন্তু সংসারে টাকা ছিল না।
মানব তখন সদ্য চাকরি পেয়েছে।
নিজের সামর্থ্যের মধ্যে নীলাঞ্জনার বই কিনে দিয়েছিল। ফর্ম পূরণ করে দিয়েছিল। চাকরির পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করেছিল।
সেই সময় নীলাঞ্জনা বলেছিল,
—“তুমি না থাকলে আমি কিছুই হতে পারতাম না।”
মানবের বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল।
“তাহলে আজ আমি কিছুই নই?”
প্রশ্নটা সে নিজেকেই করল।
কোনও উত্তর এল না।
বরং আরেকটা প্রশ্ন মাথায় ঢুকে পড়ল—
“আমি কি সত্যিই নীলাঞ্জনাকে হারিয়েছি, নাকি আমার ব্যর্থতাই আমাকে তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে?”
মানব জানত না।
তবে একটা কথা সে বুঝেছিল—
সে নীলাঞ্জনার ওপর যতটা রাগ করছে, তার চেয়েও বেশি রাগ করছে নিজের ওপর।
চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত কি ভুল ছিল?
নিজের যোগ্যতার ওপর কি সে একটু বেশি বিশ্বাস করেছিল?
সে কি সাংবাদিক ছিল, নাকি শুধু একজন স্বপ্নবাজ?
একটা সময় মানব নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
—“তুই সম্পাদক হতে চেয়েছিলি?”
আয়নার মানুষটা যেন তাকিয়ে বলল—
“তুই তো নিজের জীবনটাই সামলাতে পারলি না।”
সেই রাতে প্রথমবার মানব নিজের ওপর বিশ্বাস হারাল।
আসলে আগেরদিন অভিজাত ব্যবসায়িক পার্টিতে নীলাঞ্জনার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর সেই ক্ষত আরও গভীর হল।
নীলাঞ্জনার কথাগুলো সে বাইরে থেকে শান্তভাবে শুনেছিল।
কিন্তু ভিতরে ভিতরে প্রতিটি শব্দ যেন তার আত্মসম্মানকে ছিঁড়ে ফেলছিল।
“সফল হতে পারলে না।”
“সংসার চালাতে পারো না।”
“নিজের কাগজ খুলে কী পেলে?”
মানব সেদিন কোনও উত্তর দেয়নি।
কারণ সে জানত—
নীলাঞ্জনার কথার মধ্যে যতটা নিষ্ঠুরতা ছিল, তার চেয়েও বেশি ছিল সত্যের অংশ।
তার সংবাদপত্র তখন সত্যিই সফল হয়নি।
কিন্তু নীলাঞ্জনার সামনে দাঁড়িয়ে সে স্বীকার করতে পারেনি যে সে ভয় পেয়েছে।
সে শুধু মাথা নিচু করে বলেছিল,
—“ভালো থেকো।”
হোটেল থেকে বেরিয়ে আসার পর তার মনে হয়েছিল, সে যেন নিজের জীবনের শেষ দরজাটাও বন্ধ করে ফেলেছে।
সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে মানবের মাথায় তখন অদ্ভুত সব চিন্তা ঘুরছিল।
“যদি ফিরে যাই?”
তারপরই আরেকটা কণ্ঠ বলল—
“কোথায় ফিরবি?”
“বাড়িতে?”
“বাড়ি তো আর নেই।”
“অফিসে?”
“অফিসে বেতন দেওয়ার টাকা নেই।”
“নীলাঞ্জনার কাছে?”
“সে তো অন্য কারও সঙ্গে।”
মানব রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে নীচে তাকাল।
যেন নিচের অন্ধকার তাকে ডাকছিল না।
বরং ভয় দেখাচ্ছিল।
সে বুঝতে পারল, সে মরতে চায় কি না—সেটাও সে জানে না।
সে শুধু চাইছে এই অপমান, ব্যর্থতা আর একাকীত্বের অনুভূতিটা থেমে যাক।
তারপর হঠাৎ নিজের মায়ের কথা মনে পড়ল।
মায়ের কাঁপা হাতে ভাত মেখে খাওয়ানোর কথা।
বাবার পুরনো ঘড়ি।
প্রথম চাকরির নিয়োগপত্র হাতে নিয়ে মায়ের চোখের জল।
আর নীলাঞ্জনা।
যে একদিন বলেছিল,
—“তোমার ওপর আমার ভরসা আছে।”
মানবের বুকের ভিতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
“তাহলে আমি কি সত্যিই এতটাই হেরে গেলাম?”
ঠিক তখনই পিছন থেকে হাসির শব্দ।
দুই মেয়ে। ওরা বার বনীতা ও ভালো করে চেনে ওদের। একজন শিউলিদি আর এক এ লাইনে নতুন বোধহঢ়।
প্রথমে মানব বিরক্ত হয়েছিল।
তার মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সবাই যেন তাকে নিয়ে হাসছে।
শিউলিদি বললো "তোর অত সাহস নেই। আয় একটু বিয়ার মেরে নেন তার পর লাফ দিয়ে মরে যা।"
ও নিজেই জানে না কেন ওদের আহ্বান সাড়া দিলো।কিন্তু ওদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করার পর ধীরে ধীরে তার ভিতরের একটা শক্ত দরজা খুলতে লাগল।
তারা যখন নিজেদের জীবনের কথা বলছিল, মানব চুপ করে শুনছিল।
অভাব।
অপমান।
প্রতারিত হওয়া।
আবার উঠে দাঁড়ানো।
মানবের মনে হল, সে এতদিন নিজের কষ্টকেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কষ্ট ভেবেছিল।
শিউলি সাথে থাকা নতুন মেয়েটা হঠাৎ বলল,
—“আপনি জানেন আপনার সমস্যা কোথায়?”
মানব তাকাল।
—“আপনি কখনও বড় ঝুঁকি নেননি। আপনি শুধু প্রথমবার একটা বড় স্বপ্ন দেখেছেন। আর সেই স্বপ্নটা একটু ধাক্কা খেতেই ধরে নিয়েছেন সব শেষ।”
মানব চুপ।
কথাটা তার ভিতরে কোথাও গিয়ে লাগল।
শিউলিদি বলল,
—“ব্যর্থ হওয়া আর হেরে যাওয়া এক কথা নয়।”
মানব ধীরে ধীরে বসে পড়ল।
তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
কিন্তু এবার সেই কান্নায় শুধু অসহায়ত্ব ছিল না।
ছিল লজ্জা।
ছিল অনুতাপ।
আর তার নিচে কোথাও খুব ক্ষীণ একটা জেদ।
“আমি কি আবার চেষ্টা করতে পারি?”
শিউলি হেসে বলল,
—“চেষ্টা করার জন্য কারও অনুমতি লাগে?”
মানব প্রথমবার হাসল।
সেদিন সেতু থেকে ফেরার সময় সে জানত না তার সংবাদপত্র সফল হবে কি না।
নীলাঞ্জনা ফিরে আসবে কি না, তাও জানত না।
কিন্তু একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—
সে নিজের জীবনের শেষ সিদ্ধান্তটা কোনও অপমানের মুহূর্তে নেবে না।
তারপর শুরু হল নতুন লড়াই।
এবার আর শুধু স্বপ্ন দিয়ে নয়।
হিসাব করে।
ভুল থেকে শিখে।
প্রতিটি ব্যর্থতার কারণ খুঁজে।
একটা একটা করে পাঠক তৈরি করে।
দু’বছর পর তার সংবাদপত্র দাঁড়িয়ে গেল।
সাফল্য এল।
কিন্তু মানবের ভিতরের সেই রাতটা আর কখনও পুরোপুরি মুছে গেল না।
বরং সেই রাতটাই তাকে বদলে দিয়েছিল।
রাখি পূর্ণিমার দিন শিউলি আর ওর সাথীরা যখন তার হাতে রাখি পরিয়ে দিল, মানব অনেকক্ষণ রাখিটার দিকে তাকিয়ে ছিল।
তারপর বলল,
—“তুই সেদিন আমাকে বাঁচিয়েছিলি।”
শিউলি মাথা নাড়ল।
—“না দাদা। আমরা শুধু আপনাকে মনে করিয়ে দিয়েছিলাম যে আপনি এখনও বাঁচতে চান।”
মানব কিছু বলল না।
তার চোখ ভিজে উঠেছিল।
সে বুঝেছিল—
কখনও কখনও মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে কোনও বড় অলৌকিক ঘটনা নয়।
একটা কথা।
একটা হাত।
একজন অপরিচিত মানুষের বিশ্বাস।
আর নিজের ভিতরে লুকিয়ে থাকা সেই ক্ষীণ কণ্ঠস্বর—
“আর একবার চেষ্টা কর।”
সেদিন থেকে মানব জানত, তার সবচেয়ে বড় সাফল্য সংবাদপত্রটি নয়।
তার সবচেয়ে বড় সাফল্য—
সে একদিন নিজের ভাঙা মানুষটাকে আবার নিজের হাতেই তুলে দাঁড় করিয়েছিল।
ওর মনে একটা দুঃখ থেকে গেলো, শিউলি সাথে থাকা সেই নতুন মেয়েটা আজ আর নেই ও একটা সোনালী গোধূলি বেলায় ওই মেয়েটি ও নতুন ঘর , নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছিলো। কিন্তু সেই সোনালী গোধূলি বেলার স্বপ্ন সে পুরণ করতে পারলো না।