পল্লী গাঁয়ের নিঝুম রাত গহন অন্ধকারে ঢাকা
বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ জাগিছে একা
ঝিমিয়ে আসে গায়ের তপন নামে রাতের মায়া
পদ্মদীঘির মাঠের উপর ঢলে অলস ছায়া
আধার নামিছে গায়ের অলোকে নিঝঝুম পল্লী-পাড়া
আকাশের বুক থেকে চুঁইয়ে পরছে জোছনা রাতের ফোয়ারা
মাঠের প্রান্তের বাঁশঝাড়গুলি বাতাসে দুলিয়া কয়—
"এমন শান্ত রূপের মায়াপুরী বুঝি আর কোথাও রে নয়"
ঝিঝিদের তানে মায়াবী রাগিনী বাজিছে কানন মাঝে
কুটিররের কোনে পিদিম আলো টিমটিম করি সাজে
পদ্মিনী নদী বয়ে চলে মৃদু অলস চরন ফেলি
তারি বুক চিরে রূপালী জোছনা খেলে রূপকেলি
দূরে কোথা হতে ভেসে আসে ওই রাখালিয়া বাঁশির সুর
পল্লীর বুকে শান্তি ছড়ায় সুর সুধা সুমধুর
ঝিঁ ঝিঁ মেয়েদের একটানা সুর বাজিছে বনের কোলে
জোনাকিরা প্রদীপ জ্বালিয়ে আঁধারি শাখায় দোলে
ধীরে ধীরে ঐ গায়ের প্রান্তে নিভে এলো সব আলো
পল্লী জননী অঙ্গে এবার জড়ালো বসন কালো
গোয়াল ঘরে শান্ত গাভীটি ঘুমিয়ে পড়িছে আহা
নিশুতি রাতের প্রহর গুনছে কোথায় কে বা কাহা
ঝরা পাতার রবে মুখরিত দীঘির শান্ত জল
শ্যাওলার চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমায় শাপলা পদ্ম শতদল
ঘুমিয়ে পড়িছে সাথে গায়ের কাঁঠাল তমাল হিজলে
পল্লী জননী কোল পেতেছে মায়া কানন আঁচলে
কুয়াশা আর মায়ায় ঘেরা গায়ের শান্ত সুধা রাত
হাওয়া দুলে আম কাঁঠালের কচি পাতার হাত
ডাহুক পাখিটা কাকিয়ে উঠে দীঘির জলে ঘাটে
ক্লান্ত কৃষান ঘুমায় সুখে তার সোনার ফসল মাঠে
সবুজ পাতা শিমুল ডাল সব যে নিথর আজ
ঘুমে মগ্ন গায়ের বেবাক চন্দিমার সাজে আদুরী সাজ
কোথা হতে আসে স্নিগ্ধ সুবাস গায়ের মেঠো সে পথে
স্বপ্নপুরীর মায়াজাল যেন ঘনায় রাত হতে
কুড়ে ঘরের বেড়ার ফাঁক গলে জোছনা আসে
গরীব চাষীর ক্লান্ত আঁখি সুখ মধুর স্বপ্নে ভাসে
কলমী লতার সুবাস নিয়ে বইছে দক্ষিণ বাও
পল্লী মায়ের শীতল কোলে চোখ সঁপেছে ছাও
ছায়া ঘেরা শান্ত পাড়া দুলছে মায়ায় তাল তমালে
ঘুমিয়ে কাদা পল্লী বালা ফুরিয়ে এলো কাজল বিলে
কাজল কালো মেঘের আঁচল বিছায়ে রাতে
ঘুমিয়ে পড়ে পল্লীবধূ তার ক্লান্ত নিখিল প্রাতে
গায়ের বধূর প্রদীপ নেভায় ঘুম কাতর আঁখি
হিজল গাছের মগডালে তখন ডাকছিল নিশি পাখি
পদ্মদীঘির ঠান্ডা জলে হাওয়া দিল দোলা
গরীব মাঝি ঘুমিয়ে বিভোর নাও রেখে পাল তোলা
পল্লী মায়ের স্নেহের বুকে ঘুমিয়ে গেছে চাষি
রাখাল ছেলে স্বপ্ন দেখে বাজায় রূপার বাঁশি
দীঘির জলে ছায়া কাঁপে শাপলা শালুক ঘুমে
নিঝুম রাতে ঘুমের পরি যায় যে কপাল চুমে
পদ্মদীঘির ঠান্ডা জলে রূপা ছরায় তারা
পল্লীবধূ আকুল হয়ে তখন দিচ্ছে ডাকে সারা
হিজল তমাল বনের ধারে জোনাই থোকা থোকা
অন্ধকারে পথ হারালো বনের মায়া পোকা
হঠাৎ হাওয়ায় বনের পাতাগুলো কেমন যেন নড়ে
দীঘির জলে বকুলের ফুলগুলি আপন মনে ঝরে
মাঠের পরে মাঠ যে খা খা শান্ত নদীর কূল
হাওয়ায় দুলে হিজল শাখা আর গন্ধরাজের ফুল
দূরে কোথাও ডাকছে পেঁচা থুম হুতুম হুতুম রবে
গায়ের বধূ ক্লান্তি ভুলে ঘুমিয়ে গেছে তবে
হালকা হাওয়ায় দুলছে ধানের সবুজ পাতাখানি
গাছের পাতা চূইয়ে পড়ে হিম কুয়াশার পানি
দুলছে বাতাসে ধানের শীষেরা গন্ধ ছরায় বুকে
কৃষান ঘরের প্রদীপ নিভে পরম শান্তি সুখে
কোলাহলহীন এ নিভৃত গায়ে শান্তির ছড়া ছড়া
পল্লী মায়ের স্নেহের আঁচলে আধার রতন ভরা
মাঠের রাখাল ফিরেছে মাঠে ভাঙিছে ঘুম মেলা
পাখিরা নীড়ে ডানা উরায়ে সাঙ্গ করিছে ভোর বেলা
শ্যামল মাটির এই যে আঁচল এই যে মায়ের কোল
নিশুতি রাতেও পরান জুরায় জাগায় মধুর দোল
এমন রাত্রি,এমন জোছনা এমন শান্তির গায়ঁ-
জনমে জনমে বারেবারে যেন ফিরিয়া আসি তবে তায়