দুজনেই ভিজেছিলাম বৃষ্টিময় এক বিকেলে,
অনামিকার হৃদয় জুড়ে তখন বর্ষাকাল।

সেদিন ডুয়ার্সের আকাশ ছিল এক প্রাচীন পাণ্ডুলিপি,
মেঘেরা তার ওপর লিখছিল জলভাষার শ্লোক।

শালবনের নীরবতা, হাতির চলার অদৃশ্য পথ,
আর দূরে মূর্তি নদী,
যেন সময়ের শরীরে বয়ে যাওয়া এক দীর্ঘ ক্ষতচিহ্ন।

আমরা দাঁড়িয়েছিলাম নদীর ধারে।
বৃষ্টি পড়ছিল না,
মনে হচ্ছিল আকাশ তার বহুদিনের জমে থাকা স্মৃতি
পৃথিবীর কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছে।

অনামিকা তখন শুধু একজন মানুষ নয়,
সে ছিল বর্ষাঋতুর গোপন উপমা।
তার চোখের ভিতর আমি দেখেছিলাম
তিস্তার ভাঙন,
জলঢাকার অস্ফুট আর্তনাদ,
আর চা-বাগানের শ্রমিকের ভেজা কপালে
লেগে থাকা অসমাপ্ত জীবনের ঘ্রাণ।

নদী আমাকে বলেছিল,
স্থিরতা আসলে পাথরের ধর্ম,
মানুষের নয়।
মানুষ জন্মায় ভেসে যাওয়ার জন্য,
যেমন পাহাড়ের বুক ছেড়ে নেমে আসে জল,
আর সমুদ্রের নাম না জেনেও
পথ খুঁজে নেয়।
জঙ্গলেরা সেদিন সাক্ষী ছিল।

বহু বছর পর আজও যখন ডুয়ার্সে বৃষ্টি নামে,
আমি শুনতে পাই
নদীর ভিতর ভেঙে পড়ছে কিছু পুরোনো বিকেল।
শালগাছের পাতায় পাতায় জেগে ওঠে আমাদের নামহীন কথোপকথন।

আর বুঝি,
আমরা কেউ কারও কাছে পৌঁছাই না কখনো,
শুধু একে অপরের ভিতর দিয়ে
জীবনের মতো বয়ে যাই।
দুজনেই ভিজেছিলাম বৃষ্টিময় এক বিকেলে,
অনামিকার হৃদয় জুড়ে তখন বর্ষাকাল।

আর আমার ভিতরে জন্ম নিচ্ছিল এক নদী,
যে আজও ডুয়ার্সের জঙ্গল পেরিয়ে
মানুষ হয়ে ওঠার গল্প বলে।