১৯৪৬-এর ভারতকে বুঝতে গেলে প্রথমেই একটি ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হয়—সেটা হল, ১৬ আগস্ট ১৯৪৬-এর সকাল পর্যন্ত ভারত একটি রাজনৈতিকভাবে স্বাভাবিক দেশ ছিল, আর সেই দিন হঠাৎ কলকাতার রাস্তায় সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা বিস্ফোরিত হল। ইতিহাস তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
১৬ আগস্ট ১৯৪৬ ছিল বিস্ফোরণের দিন; বিস্ফোরক জমা হচ্ছিল বহু বছর ধরে। মনে রাখতে হবে, সেই বিস্ফোরকও নিজে নিজে তৈরি হয়নি। তার মধ্যে ছিল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের কাঠামো, সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও সংখ্যালঘুতার রাজনৈতিক হিসাব, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের পারস্পরিক অবিশ্বাস, বাংলার বিশেষ সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং সর্বোপরি—স্বাধীনতা কী রকম হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে গভীর মতভেদ।
১৯৪৬ সালের শুরুতে ভারতীয় রাজনীতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য ছিল এই যে, স্বাধীনতা তখন আর দূরের স্বপ্ন নয়, অথচ স্বাধীনতার রূপই অনিশ্চিত।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বুঝতে শুরু করেছে যে ভারতে পুরনো পদ্ধতিতে শাসন দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব নয়। ১৯৪৫ সালের জুলাইয়ে ব্রিটেনে লেবার পার্টির ক্ষমতায় আসা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ অর্থনীতির দুর্বলতা এবং ভারতীয় রাজনৈতিক শক্তিগুলির ক্রমবর্ধমান চাপ—সব মিলিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নটি বাস্তব রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছিল।
১৯৪৫ সালের আগস্টে ভাইসরয় ওয়াভেল ঘোষণা করেন যে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভাগুলির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বাংলায় যুদ্ধের কারণে ১৯৩৭-এর পর আর সাধারণ নির্বাচন হয়নি। ফলে ১৯৪৬-এর নির্বাচন হয়ে উঠল দীর্ঘ বিরতির পর জনগণের রাজনৈতিক মনোভাব যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
এই নির্বাচনকে কেবল নির্বাচন বলা যাবে না। এটি ছিল আসন্ন স্বাধীনতার আগে ভারতীয় রাজনীতির শক্তির পরীক্ষা।
কংগ্রেসের সামনে ছিল একটি ভারতীয় জাতীয় রাষ্ট্রের দাবি; মুসলিম লীগের সামনে ছিল মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক জাতিসত্তার দাবিকে বাস্তব ক্ষমতায় রূপ দেওয়ার প্রশ্ন।
কেন্দ্রীয় আইনসভা এবং প্রাদেশিক নির্বাচনের ফল এই দ্বৈত বাস্তবতাকে অত্যন্ত স্পষ্ট করে। কেন্দ্রীয় আইনসভার ১০২টি নির্বাচিত আসনের মধ্যে কংগ্রেস ৫৭টি এবং মুসলিম লীগ ৩০টি পেয়েছিল।
প্রাদেশিক নির্বাচনে কংগ্রেস ১৫৮৫টির মধ্যে ৯২৩টি আসন জিতেছিল এবং সাধারণ আসনে তার শক্তি ছিল বিপুল। অন্যদিকে মুসলিম-নির্দিষ্ট আসনে লীগের সাফল্য ছিল অভূতপূর্ব। ১৯৪৬-এর নির্বাচনে লীগ ভারতের মোট মুসলিম ভোটের প্রায় ৭৬ শতাংশ পেয়েছিল। ১৯৩৭ সালে এই সমর্থন ছিল মাত্র ৪.৮ শতাংশের কাছাকাছি। বাংলায় মুসলিম ভোটের প্রায় ৮৩.৬ শতাংশ লীগ পেয়েছিল।
এই সংখ্যাগুলির রাজনৈতিক অর্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কংগ্রেসের পক্ষে বলা সম্ভব হল—দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তাদের সঙ্গে আছে। মুসলিম লীগের পক্ষে আরও নির্দিষ্ট একটি দাবি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হল—ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে মুসলিম লীগকে উপেক্ষা করার আর সুযোগ নেই।
কিন্তু এখানেই ইতিহাসের একটি সূক্ষ্মতা রয়েছে।
‘মুসলিম লীগ মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করেছিল’—এই বক্তব্য এবং ‘প্রত্যেক মুসলমান পাকিস্তান চেয়েছিল’—এই বক্তব্য এক নয়।
১৯৪৬-এর নির্বাচনী ব্যবস্থা ছিল সীমিত ভোটাধিকার, পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী এবং সংরক্ষিত আসনের উপর নির্মিত। ফলে নির্বাচনের ফলকে আধুনিক অর্থে সর্বজনীন গণভোট হিসেবে ধরা যায় না।
বাংলার নির্বাচনের হিসাবেও দেখা যায়, সব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন মিলিয়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের ভোটের চিত্র ছিল আরও জটিল। ফলে লীগের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাস্তব এবং শক্তিশালী হলেও তাকে ‘সমস্ত মুসলমানের একই মত’ হিসেবে পড়লে ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরলীকরণ করা হয়।
বাংলার নির্বাচনের ফল আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ২৫০ সদস্যের আইনসভায় মুসলিম লীগ ১১৪টি আসন পায়, কংগ্রেস ৮৬টি; ইউরোপীয় সদস্য ছিলেন ২৫ জন এবং অন্যান্য স্বাধীন ও ক্ষুদ্র দল ও গোষ্ঠীর সদস্যও ছিল।
২৩ এপ্রিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে লীগ মন্ত্রিসভা গঠিত হয়।
সোহরাওয়ার্দীর ক্ষমতায় আসা তাই কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ১৯৪৬-এর নির্বাচনী রাজনীতির ফল।
কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর সরকার এমন একটি শহর শাসন করছিল, যেখানে জনসংখ্যার ধর্মীয় ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য এক ছিল না। বাংলার গ্রামাঞ্চলে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। কলকাতা ছিল প্রধানত হিন্দু-অধ্যুষিত এবং ঔপনিবেশিক অর্থনীতি, বাণিজ্য, শিক্ষা ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
ফলে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ কারা’ এবং ‘ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায়’—এই দুটি প্রশ্নের উত্তর এক ছিল না।
এখানে সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক অবস্থান বোঝা জরুরি।
তিনি কেবল মুসলিম লীগের একজন প্রাদেশিক নেতা ছিলেন না; তিনি বাংলার প্রধানমন্ত্রীও। তাঁর রাজনৈতিক সাফল্য নির্ভর করছিল একদিকে মুসলিম লীগের শক্তিশালী মুসলিম ভোটব্যাংকের উপর, অন্যদিকে এমন একটি প্রদেশ পরিচালনার উপর যেখানে বিরাট হিন্দু জনগোষ্ঠীও ছিল।
এই দ্বন্দ্বই পরবর্তীকালে তাঁর ভূমিকা বিচার করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কিন্তু তার আগে আরও বড় প্রশ্নটি বুঝতে হবে—মুসলিম লীগ কেন ১৯৪৬-এ পাকিস্তানের প্রশ্নকে এত তীব্রভাবে সামনে আনল?
এখানে মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর রাজনৈতিক যুক্তিকে তার নিজস্ব পরিপ্রেক্ষিতে দেখা দরকার।
জিন্নাহর কাছে সমস্যা কেবল ধর্মীয় স্বাধীনতার ছিল না। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে ছিল ক্ষমতার কাঠামো। যদি স্বাধীন ভারতে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত হয় এবং সেই কেন্দ্রে স্থায়ী হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে, তবে মুসলিম-অধ্যুষিত প্রদেশগুলির রাজনৈতিক ক্ষমতা কতটা নিরাপদ থাকবে—এই প্রশ্ন তিনি ক্রমশ সামনে আনছিলেন।
তাঁর যুক্তি ছিল, ভারতীয় মুসলমানরা কেবল একটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু নয়; তারা একটি পৃথক রাজনৈতিক জাতি।
এই বক্তব্যের মধ্যে রাজনৈতিক কৌশল অবশ্যই ছিল। কিন্তু তাকে কেবল কৌশল বলে উড়িয়ে দিলে জিন্নাহর সাফল্যের কারণ বোঝা যায় না। রাজনৈতিক কৌশল তখনই গণভিত্তি পায় যখন সমাজের একটি অংশ তার মধ্যে নিজের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের প্রশ্নের উত্তর দেখতে পায়।
এখানেই কংগ্রেসের সঙ্গে লীগের মৌলিক সংঘাত।
কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদ ছিল মূলত ভূখণ্ডভিত্তিক—ভারত একটি রাজনৈতিক জাতি, তার নাগরিকদের ধর্ম নির্বিশেষে একটি অভিন্ন রাষ্ট্রের অংশ হওয়া উচিত।
মুসলিম লীগের রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদ ক্রমশ সম্প্রদায়ভিত্তিক রাজনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নকে রাষ্ট্রগঠনের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
দুই পক্ষের অবস্থানকে আজকের ভাষায় ‘ধর্মনিরপেক্ষ বনাম সাম্প্রদায়িক’ বলে শেষ করে দেওয়া সহজ। কিন্তু ১৯৪৬-এর বাস্তব রাজনৈতিক বিতর্ক ছিল আরও কঠিন।
কংগ্রেসের সামনে প্রশ্ন ছিল—একটি রাষ্ট্র কতটা দুর্বল কেন্দ্র নিয়ে টিকে থাকতে পারে?
লীগের সামনে প্রশ্ন ছিল—একটি শক্তিশালী কেন্দ্র যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের হাতে থাকে, তাহলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলি কতটা স্বায়ত্তশাসন পাবে?
এই দুই প্রশ্নের মধ্যে আপসের সম্ভাবনাই ছিল ১৯৪৬-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা।
আর সেই পরীক্ষার নাম—Cabinet Mission।
১৯৪৬ সালের মার্চে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার তিন সদস্য—লর্ড পেথিক-লরেন্স, স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস এবং এ. ভি. আলেকজান্ডার ভারতে আসেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে একটি সাংবিধানিক সমঝোতা তৈরি করা।
প্রস্তাবটি পাকিস্তানকে সরাসরি স্বীকৃতি দেয়নি; বরং একটি ভারতীয় ইউনিয়ন রাখার চেষ্টা করেছিল, যার কেন্দ্রীয় ক্ষমতা সীমিত থাকবে মূলত প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র এবং যোগাযোগের মতো বিষয়ের মধ্যে। অধিকাংশ ক্ষমতা থাকবে প্রদেশের হাতে। প্রদেশগুলিকে আবার তিনটি গ্রুপে সংগঠিত করার পরিকল্পনা ছিল।
এটি ছিল এক অসাধারণ রাজনৈতিক আপসের প্রস্তাব।
জিন্নাহ চাইছিলেন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলির রাজনৈতিক নিরাপত্তা। কংগ্রেস চাইছিল ভারতের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ঐক্য। ব্রিটিশরা চাইছিল এমন একটি সাংবিধানিক সমাধান যাতে ভারতকে সম্পূর্ণ ভেঙে দেওয়া না হয়, কিন্তু মুসলিম লীগের উদ্বেগও অগ্রাহ্য না হয়।
Cabinet Mission-এর পরিকল্পনা সেই তিনটি আকাঙ্ক্ষাকে একই কাঠামোর মধ্যে ধরে রাখার চেষ্টা করেছিল।
কিন্তু সমস্যা ছিল—প্রস্তাবের ভাষা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যাখ্যা নিয়ে কংগ্রেস ও লীগের মধ্যে মৌলিক মতভেদ।
জওহরলাল নেহরু একটি আধুনিক, পরিকল্পিত, অর্থনৈতিকভাবে সমন্বিত এবং শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ভারত কল্পনা করছিলেন। জিন্নাহর আশঙ্কা ছিল—একটি শক্তিশালী কেন্দ্র কার্যত সংখ্যাগরিষ্ঠের স্থায়ী রাজনৈতিক আধিপত্য তৈরি করতে পারে।
দুই নেতার মধ্যে বিরোধ তাই শুধু ব্যক্তিগত ছিল না।
এটি ছিল রাষ্ট্রের প্রকৃতি নিয়ে বিরোধ।
গান্ধীর অবস্থান আবার কিছুটা আলাদা। তিনি ভারতীয় ঐক্যকে গভীর নৈতিক ও সভ্যতাগত মূল্য হিসেবে দেখতেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক চিন্তায় রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের প্রতি নেহরুর মতো আকর্ষণ ছিল না। তিনি জনগণের পারস্পরিক আস্থা ও নৈতিক সম্পর্ককে রাজনৈতিক সমাধানের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে দেখতেন।
অতএব একই কংগ্রেসের মধ্যেও রাষ্ট্র, কেন্দ্র, প্রদেশ এবং সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন নিয়ে সম্পূর্ণ অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না।
বাংলার ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য।
১৯৪৬-এর নির্বাচনে মুসলিম লীগ বিপুল সাফল্য পেলেও বাংলার মুসলিম রাজনীতি পুরোপুরি একরকম ছিল না। ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির ঐতিহ্য, আবুল হাশিমের মতো নেতাদের রাজনৈতিক চিন্তা, গ্রামীণ কৃষকের অর্থনৈতিক দাবি এবং কলকাতাকেন্দ্রিক মুসলিম মধ্যবিত্তের আকাঙ্ক্ষা—সব এক ছিল না।
আবার হিন্দু সমাজেও কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা, বামপন্থী রাজনীতি, জমিদার ও মধ্যবিত্ত স্বার্থ—সব একই রাজনৈতিক অবস্থানে ছিল না।
এই বহুত্বই ১৯৪৬-এর বাংলা।
কিন্তু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শক্তি এখানেই—সে বহু ভিন্ন স্বার্থকে একটি বৃহত্তর ‘আমরা’-তে সংগঠিত করতে পারে।
একজন দরিদ্র মুসলমান কৃষক এবং একজন ধনী মুসলমান জমিদারের অর্থনৈতিক স্বার্থ এক নয়; কিন্তু ‘মুসলমানদের রাজনৈতিক নিরাপত্তা’ তাদের একটি সাধারণ রাজনৈতিক পরিচয়ে আনতে পারে।
একইভাবে একজন হিন্দু শ্রমিক এবং একজন হিন্দু ব্যবসায়ীর অর্থনৈতিক স্বার্থ এক নয়; কিন্তু ‘হিন্দু সমাজের বিপদ’—এই ধারণা তাদেরও একটি রাজনৈতিক পরিচয়ে আনতে পারে।
১৯৪৬-এর দিকে এগোতে এগোতে এই প্রক্রিয়াই ভয়ংকর হয়ে উঠছিল।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের ক্ষত।
দুর্ভিক্ষকে ১৯৪৬-এর দাঙ্গার সরাসরি কারণ বলা যাবে না। কিন্তু যুদ্ধ, খাদ্যসংকট, মূল্যবৃদ্ধি এবং দুর্ভিক্ষ বাংলার সামাজিক কাঠামোকে গভীরভাবে দুর্বল করেছিল। মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমেছিল, শহর-গ্রামের সম্পর্ক বদলেছিল, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বেড়েছিল।
এই দুর্বল সামাজিক পরিবেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও সহজে গভীরে প্রবেশ করতে পেরেছিল।
বাংলার গভর্নর ফ্রেডেরিক বারোজ পরে ২২ আগস্ট ১৯৪৬-এ ভাইসরয় ওয়াভেলকে যে রিপোর্ট পাঠান, সেখানে কলকাতার দাঙ্গার দীর্ঘমেয়াদি কারণ হিসেবে হিন্দু-মুসলমানের দীর্ঘ ক্ষমতার সংঘাত, ব্রিটিশ কর্তৃত্বের দুর্বলতা, যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের কারণে কলকাতার স্বাভাবিক জীবনযাত্রার বিপর্যয় এবং একটি প্রধানত হিন্দু শহরে মুসলিম মন্ত্রিসভার অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন।
একই রিপোর্টে তিনি ২৯ জুলাই মুসলিম লীগের Direct Action-এর সিদ্ধান্ত এবং ১৬ আগস্টকে Direct Action Day করার সিদ্ধান্তকে তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
এই সরকারি মূল্যায়ন মূল্যবান, যদিও একে শেষ সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না।
কারণ প্রশাসনের নিজের ব্যর্থতার বিচার করতে গিয়ে প্রশাসনের রিপোর্টও স্বভাবতই একটি রাজনৈতিক নথি।
তবু এর গুরুত্ব আছে।
কারণ বারোজ নিজেই দীর্ঘমেয়াদি কারণ এবং তাৎক্ষণিক কারণের মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন।
এই পার্থক্যই আমাদের গবেষণার ভিত্তি হওয়া উচিত।
দাঙ্গার দীর্ঘমেয়াদি কারণ খুঁজতে গেলে আমরা যাব বহু দশক পিছনে।
কিন্তু ১৬ আগস্টের নির্দিষ্ট বিস্ফোরণ ব্যাখ্যা করতে গেলে ২৯ জুলাই ১৯৪৬-এর সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করা যাবে না।
২৯ জুলাই বোম্বাইয়ে মুসলিম লীগের কাউন্সিল Cabinet Mission Plan থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে এবং পাকিস্তান অর্জনের লক্ষ্যে Direct Action-এর ডাক দেয়। ১৬ আগস্ট নির্ধারিত হয় Direct Action Day হিসেবে।
এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক যুক্তি ছিল—সাংবিধানিক দর-কষাকষি ব্যর্থ হলে মুসলিম লীগ তার শক্তি প্রদর্শন করবে।
কিন্তু এখানেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়ের প্রশ্ন শুরু হয়।
একটি দল রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারে—এটি তার রাজনৈতিক অধিকার। কিন্তু এমন কর্মসূচির সম্ভাব্য সামাজিক ফল সম্পর্কে নেতৃত্ব কতটা সচেতন ছিল?
একটি উত্তেজনাপূর্ণ, সাম্প্রদায়িকভাবে বিভক্ত শহরে ধর্মঘট, মিছিল, বিশাল জনসমাবেশ এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা একত্র হলে কী ঘটতে পারে—এই প্রশ্ন কি নেতৃত্বের সামনে ছিল না?
এই প্রশ্নের উত্তরই পরবর্তী অধ্যায়গুলিতে আমাদের বিশেষভাবে খুঁজতে হবে।
কারণ ইতিহাসের বিচারে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন শুধু ঘোষিত উদ্দেশ্য দিয়ে হয় না; সেই সিদ্ধান্তের পূর্বানুমেয় পরিণতিও বিবেচনা করতে হয়।
তবে একই ন্যায়বিচার অন্য পক্ষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
Direct Action-এর সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক দায় যেমন পরীক্ষা করতে হবে, তেমনই ১৬ আগস্টের পর প্রতিশোধমূলক সহিংসতা, সংগঠিত প্রতিরোধ, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং হিন্দু রাজনৈতিক সংগঠনগুলির ভূমিকা নিয়েও একই নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে।
কোনো একটি পক্ষের অপরাধ অন্য পক্ষের অপরাধকে নির্দোষ করে না।
এটাই এই গ্রন্থের সবচেয়ে কঠিন নৈতিক অবস্থান।
১৯৪৬-এর ইতিহাসকে যদি প্রতিশোধের ভাষায় লেখা হয়, তবে ইতিহাস আর ইতিহাস থাকে না; তা হয়ে ওঠে সাম্প্রদায়িক স্মৃতির রাজনৈতিক অস্ত্র।
আমরা সেই পথে যাব না।
বরং প্রশ্ন করব—
কেন ১৯৪৬-এর ভারত এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছিল যেখানে একটি সাংবিধানিক বিরোধ রাস্তায় নেমে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পরিণত হতে পারল?
উত্তরটি একদিনে তৈরি হয়নি।
ঔপনিবেশিক শাসন ধর্মীয় পরিচয়কে প্রতিনিধিত্বের কাঠামোয় স্থান দিয়েছিল। ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই কাঠামোর মধ্যে নিজেদের স্বার্থ ও নিরাপত্তার দাবি গড়ে তুলেছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু উভয়ের মধ্যেই ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় তৈরি হয়েছিল।
কংগ্রেস ও লীগ ঐক্যবদ্ধ ভারতের প্রকৃতি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছিল।
Cabinet Mission ছিল সেই অচলাবস্থা কাটানোর শেষ বড় প্রচেষ্টা।
আর সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর রাজনীতি ক্রমশ সাংবিধানিক আলোচনার টেবিল থেকে জনসমাবেশের রাস্তায় চলে আসে।
কলকাতা তখন কেবল বাংলার রাজধানী নয়; এটি ছিল রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের প্রতীকী মঞ্চ।
মুসলিম লীগের কাছে কলকাতায় বিপুল জনসমাবেশ দেখানো মানে ছিল বাংলায় এবং সর্বভারতীয় রাজনীতিতে নিজের শক্তি প্রদর্শন।
কংগ্রেসপন্থী ও হিন্দু রাজনৈতিক শক্তির কাছে একই ঘটনা অন্য অর্থ বহন করতে পারত—কলকাতার মতো একটি প্রধানত হিন্দু শহরে লীগ সরকারের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন তাদের কাছে ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সংকেত হিসেবে প্রতিভাত হতে পারত।
এই পারস্পরিক ভয়ের রাজনীতিই ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক।
কারণ দাঙ্গা শুরু হওয়ার আগে মানুষ একে অপরকে শুধু ব্যক্তি হিসেবে দেখতে থাকে না; দেখতে শুরু করে বৃহত্তর কোনো ‘সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি’ হিসেবে।
সেই মুহূর্তে একজন দোকানদার আর কেবল দোকানদার থাকে না।
সে ‘হিন্দু’ বা ‘মুসলমান’ হয়ে যায়।
একজন শ্রমিক আর কেবল শ্রমিক থাকে না।
সে ‘আমাদের লোক’ বা ‘ওদের লোক’ হয়ে যায়।
এবং তখন রাজনৈতিক বিরোধের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই সাধারণ মানুষ, যার হাতে কোনো সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল না।
এইখানেই ১৯৪৬-এর ইতিহাসের ট্র্যাজেডি।
স্বাধীনতার জন্য যে দেশ কয়েক দশক সংগ্রাম করেছে, স্বাধীনতার ঠিক আগে সেই দেশকে নিজের মানুষের পারস্পরিক নিরাপত্তার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
আর তাই ১৯৪৬-এর ইতিহাসকে শুধু ‘দাঙ্গার ইতিহাস’ বলা যথেষ্ট নয়।
এটি ছিল একটি রাষ্ট্র জন্ম নেওয়ার আগে তার রাজনৈতিক কল্পনার ভেঙে পড়ার ইতিহাস।



অধ্যায় দুই
বাংলার ভিতরে যে দ্বন্দ্ব জমছিল....


বাংলার ১৯৪৬-কে শুধু দিল্লি, বোম্বাই কিংবা লাহোরের রাজনীতির প্রতিফলন হিসেবে দেখলে ইতিহাসের একটি বড় সত্য হারিয়ে যায়।
কলকাতার রাস্তায় যে সংঘর্ষ ১৬ আগস্টে বিস্ফোরিত হয়েছিল, তার রাজনৈতিক অভিঘাত অবশ্যই সর্বভারতীয় ছিল; কিন্তু তার সামাজিক মাটি ছিল বাংলার নিজস্ব।
এই মাটির ভিতরে ছিল জমির সম্পর্ক, কৃষকের ঋণ, জমিদারি, শিক্ষার অসম বিস্তার, সরকারি চাকরিতে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন, কলকাতাকেন্দ্রিক অর্থনীতি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে নিজেকে বঞ্চিত মনে করা এক বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং শিক্ষিত, নগরকেন্দ্রিক, অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হিন্দু মধ্যবিত্তের পারস্পরিক সন্দেহ।
এই দ্বন্দ্বের শিকড় ১৯৪৬-এ নয়।
বরং ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকেই বাংলার আধুনিক রাজনীতির ভিতর একটি প্রশ্ন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল—
‘কার বাংলা?’
প্রশ্নটি শুনতে যত সরল, তার উত্তর তত নয়।
জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলার বৃহত্তর পূর্বাঞ্চলে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু ঔপনিবেশিক আধুনিকতার যে প্রতিষ্ঠানগুলি নতুন ক্ষমতা তৈরি করেছিল—ইংরেজি শিক্ষা, আদালত, সরকারি চাকরি, নগর বাণিজ্য, সংবাদপত্র, পেশাজীবী শ্রেণি—সেখানে হিন্দু ভদ্রলোক সমাজের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।
এর ঐতিহাসিক কারণও ছিল। ইংরেজি শিক্ষার প্রসার, কলকাতাকে কেন্দ্র করে নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্তের উত্থান, কোম্পানি ও ব্রিটিশ প্রশাসনের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন হিন্দু উচ্চবর্ণের ঘনিষ্ঠতা—এসবের ফলে বাংলার আধুনিক পেশাজীবী শ্রেণিতে হিন্দুদের প্রাধান্য গড়ে ওঠে।
অন্যদিকে বাংলার মুসলমান সমাজের বৃহৎ অংশ ছিল গ্রামীণ কৃষিনির্ভর, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং আধুনিক শিক্ষার সুযোগ থেকে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে।
কিন্তু এই বর্ণনাকেও সরলীকরণ করা বিপজ্জনক।
‘হিন্দু মানেই শহুরে শিক্ষিত’ এবং ‘মুসলমান মানেই দরিদ্র কৃষক’—এমন কোনো যান্ত্রিক সত্য ছিল না। বাংলায় মুসলিম জমিদার, পেশাজীবী ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তও ছিল; হিন্দু কৃষক ও দরিদ্র শ্রমজীবীও ছিল।
তবু সামগ্রিক সামাজিক কাঠামোয় এই অর্থনৈতিক-শিক্ষাগত অসমতা এত প্রবল ছিল যে রাজনৈতিক পরিচয়কে ধর্মীয় রেখায় সংগঠিত করার জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছিল।
এখানে ঔপনিবেশিক ভূমিস্বত্ব ব্যবস্থার কথাও আসতে হয়।
১৭৯৩ সালের Permanent Settlement বাংলার জমিদারি কাঠামোকে একটি নতুন আইনি রূপ দেয়। জমিদাররা ভূমির রাজস্ব আদায়ের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে শক্তিশালী হন, আর কৃষকের সঙ্গে জমির সম্পর্ক ক্রমশ জটিল হয়।
পরবর্তী শতাব্দীতে এই ব্যবস্থার সামাজিক ফল একেবারে অভিন্ন ছিল না; বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের জমিদার, মধ্যস্বত্বভোগী ও কৃষক-সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু পূর্ববঙ্গের বহু অঞ্চলে মুসলমান কৃষক এবং হিন্দু জমিদার বা মধ্যস্বত্বভোগীর সম্পর্ক রাজনৈতিক ভাষায় ধীরে ধীরে একটি সাম্প্রদায়িক অর্থ পেতে শুরু করে।
এখানেই অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের একটি বিপজ্জনক রূপান্তর ঘটে।
একজন কৃষকের সমস্যা ছিল খাজনা, ঋণ, জমির দখল, মহাজনি শোষণ।
কিন্তু যখন তার রাজনৈতিক ভাষা ক্রমশ ধর্মীয় সংগঠনের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে শুরু করল, তখন সেই অর্থনৈতিক সমস্যার পাশে একটি নতুন ব্যাখ্যা দাঁড়াল—
‘আমাদের সম্প্রদায় বঞ্চিত।’
অন্যদিকে জমিদার বা শহুরে মধ্যবিত্তের কাছে কৃষকের রাজনৈতিক সংগঠন কখনও কেবল শ্রেণি-প্রশ্ন ছিল না; সেটি ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনৈতিক উত্থান হিসেবেও প্রতিভাত হতে শুরু করেছিল।
এইভাবে শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের সীমারেখা একে অপরের উপর এসে পড়ে।
এটি ছিল বাংলার সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলির একটি।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এই প্রক্রিয়াকে নতুন রাজনৈতিক গতি দেয়।
লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের ফলে বাংলা ভাগ হয়ে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে একটি নতুন প্রদেশ তৈরি হয়, যার প্রশাসনিক কেন্দ্র হয় ঢাকা। পূর্ববঙ্গে মুসলমান জনসংখ্যা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ।
বঙ্গভঙ্গের সমর্থকদের মধ্যে একটি অংশ মনে করেছিল যে পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা নতুন প্রদেশে প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত সুযোগ পাবে। অন্যদিকে কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্তের বড় অংশ বঙ্গভঙ্গকে বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের বিরুদ্ধে আঘাত হিসেবে দেখেছিল।
স্বদেশি আন্দোলন বঙ্গভঙ্গবিরোধী প্রতিবাদকে এক অসাধারণ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে।
কিন্তু এখানেই ইতিহাসের একটি জটিলতা তৈরি হয়।
বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন নিজেকে বাংলা ও ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেও পূর্ববঙ্গের বহু মুসলমানের কাছে তার রাজনৈতিক ভাষা সবসময় সমানভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
কারণ তাঁদের সামাজিক অভিজ্ঞতা ছিল আলাদা।
এই বিচ্ছিন্নতা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বা অবশ্যম্ভাবী ছিল না। জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব যদি শ্রেণি, জমি, শিক্ষা এবং প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে পারত, পরিস্থিতি অন্য রকমও হতে পারত।
১৯০৬ সালে ঢাকায় All-India Muslim League প্রতিষ্ঠার পেছনে বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
মুসলিম লীগের প্রাথমিক নেতৃত্বের বড় অংশ ছিল অভিজাত ও শিক্ষিত মুসলিম রাজনীতিকদের মধ্যে; তাদের লক্ষ্য তখনই সরাসরি পাকিস্তান তৈরি করা ছিল না।
বরং মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, প্রশাসনিক সুযোগ এবং সাংবিধানিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল প্রধান প্রশ্ন।
এই তথ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ পরে ১৯৪৬-এর পাকিস্তান দাবিকে দেখে অনেকে মনে করেন যেন মুসলিম লীগ তার জন্মলগ্ন থেকেই দেশভাগের জন্য তৈরি হয়েছিল।
ইতিহাস তা বলে না।
১৯০৬ থেকে ১৯৪০ পর্যন্ত লীগের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে বড় পরিবর্তন ঘটেছে। সেই পরিবর্তনই আমাদের বুঝতে হবে।
একইভাবে কংগ্রেসের ইতিহাসও একরৈখিক নয়।
১৯১৬ সালের Lucknow Pact কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের রাজনৈতিক সমঝোতার একটি বড় উদাহরণ। পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর নীতিকে স্বীকার করে দুই দল সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নে সমঝোতায় পৌঁছেছিল।
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে কংগ্রেস ও লীগের বিরোধ কোনো চিরস্থায়ী ধর্মীয় শত্রুতা ছিল না।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের সময় গান্ধী হিন্দু-মুসলিম ঐক্যকে স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে সামনে আনেন।
কয়েক বছরের জন্য সত্যিই একটি অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সহযোগিতা দেখা যায়।
কিন্তু ১৯২০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ বাড়তে থাকে এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক ক্রমশ অবিশ্বাসে আক্রান্ত হয়।
জিন্নাহর রাজনীতির ক্ষেত্রেও বিপরীত প্রশ্ন উঠবে।
তিনি মুসলমানদের রাজনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি যে ‘মুসলিম জাতি’র ধারণা নির্মাণ করেন, তার ফলে মুসলমান সমাজের অভ্যন্তরীণ শ্রেণিগত ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্য অনেকাংশে আড়াল হয়ে যায়।
এই দ্বন্দ্বটি বাংলায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ বাংলার মুসলমান কৃষক পাকিস্তানকে কী অর্থে দেখছিলেন?
তিনি কি জিন্নাহর সাংবিধানিক তত্ত্বের ভাষায় পাকিস্তানকে দেখছিলেন?
নাকি তিনি ভাবছিলেন—একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার হলে জমিদারি শোষণ কমবে, শিক্ষা ও চাকরিতে সুযোগ বাড়বে এবং কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু আধিপত্যের অবসান হবে?
সম্ভবত সব অঞ্চলে উত্তর এক ছিল না।
কিন্তু মুসলিম লীগের সাফল্যের অন্যতম কারণ ছিল—সে এই বিচিত্র প্রত্যাশাগুলিকে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতীকে যুক্ত করতে পেরেছিল।
‘পাকিস্তান’ তাই শুধু একটি ভূখণ্ডের নাম ছিল না।
বিভিন্ন মানুষের কাছে তার অর্থ ছিল ভিন্ন।
কারও কাছে নিরাপত্তা।
কারও কাছে মর্যাদা।
কারও কাছে ক্ষমতায় অংশগ্রহণ।
কারও কাছে ধর্মীয় স্বাধীনতা।
কারও কাছে জমিদারি ও সামাজিক আধিপত্যের অবসানের সম্ভাবনা।
আর রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই বহুবিধ অর্থকে একটি একক রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত করেছিল।
এই কারণেই ১৯৪০-এর Lahore Resolution-এর রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে গেলে তার ভাষার দিকে তাকাতে হয়।
প্রস্তাবটি ‘Pakistan’ শব্দটি ব্যবহার করেনি; বরং উত্তর-পশ্চিম ও পূর্ব ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলিকে স্বাধীন রাজনৈতিক একক হিসেবে গঠনের কথা বলেছিল। পরবর্তী রাজনৈতিক প্রচারে এই ধারণাই ক্রমে পাকিস্তানের দাবির নির্দিষ্ট ভূখণ্ডগত অর্থ পায়।
এখানে জিন্নাহর রাজনৈতিক কৌশলের অসাধারণ দিকটি ছিল—তিনি পাকিস্তানের ধারণাকে এমনভাবে ব্যবহার করেছিলেন যাতে সাংবিধানিক দর-কষাকষির ক্ষেত্রও খোলা থাকে।
১৯৪৬-এ এসে এই কৌশল আরও কঠোর হয়।
কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে আরেকটি চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ—এ. কে. ফজলুল হক।
ফজলুল হকের রাজনীতি দেখায় যে বাংলার মুসলমান রাজনীতি কখনও সম্পূর্ণভাবে মুসলিম লীগের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। তাঁর কৃষক প্রজা পার্টির রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল গ্রামীণ কৃষকসমাজ এবং জমিদারি সম্পর্কের প্রশ্ন।
১৯৩৭-এর নির্বাচনে তাঁর উত্থান দেখিয়ে দিয়েছিল যে মুসলমান ভোটারদের কাছে ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি কৃষি ও অর্থনৈতিক প্রশ্নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফজলুল হক পরবর্তীকালে মুসলিম লীগের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত হন এবং ১৯৪০ সালে Lahore Resolution উপস্থাপন করেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে জিন্নাহর সম্পর্ক সবসময় মসৃণ ছিল না।
এই ঘটনাটির মধ্যে একটি গভীর শিক্ষা রয়েছে।
মুসলমান সমাজের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং মুসলিম লীগের রাজনৈতিক আধিপত্য—দুটি একই বিষয় নয়।
১৯৩৭-এর বাংলা এই পার্থক্যটি স্পষ্ট করেছিল।
১৯৪৬-এর নির্বাচন এসে সেই পার্থক্য অনেকটাই সংকুচিত করে দেয়।
এর পেছনে ছিল ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৫-এর মধ্যকার রাজনৈতিক পরিবর্তন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কংগ্রেস মন্ত্রিসভার পদত্যাগ, মুসলিম লীগের সংগঠন বিস্তার, পাকিস্তান দাবির জনপ্রিয়ীকরণ এবং ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ।
বিশেষ করে দুর্ভিক্ষের বিষয়টি এখানে থামিয়ে দেখা দরকার।
১৯৪৩-এর Bengal Famine-এ বিপুল মানুষের মৃত্যু শুধু খাদ্যের অভাবের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল যুদ্ধকালীন অর্থনীতি, সরবরাহ ব্যবস্থা, পরিবহন, মজুতদারি, মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত এক বহুমাত্রিক বিপর্যয়।
দুর্ভিক্ষের পর বাংলার সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যে সমাজে মানুষ কয়েক বছর আগেই ক্ষুধা ও মৃত্যুর এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে, সেখানে রাজনৈতিক ভাষা আগের মতো থাকার কথা নয়।
এই পরিস্থিতিতে ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠনগুলি মানুষের ভয়কে রাজনৈতিক অর্থ দিতে সক্ষম হয়।
এটি শুধু মুসলিম লীগের ক্ষেত্রে নয়।
হিন্দু রাজনৈতিক সংগঠনগুলিও মুসলিম লীগের উত্থানকে ব্যবহার করে হিন্দু সমাজের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াতে সক্ষম হয়েছিল।
বিশেষ করে বাংলার হিন্দু মধ্যবিত্তের একাংশের কাছে পাকিস্তানের দাবি ক্রমশ কেবল একটি মুসলিম রাজনৈতিক দাবিই নয়—বরং তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিপদ হিসেবে দেখা দিতে থাকে।
এখানে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বাংলার হিন্দু মধ্যবিত্তের এক শক্তিশালী রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন। তাঁর রাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল বাংলার হিন্দুদের রাজনৈতিক নিরাপত্তা।
তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে ছিল একটি বাস্তব উদ্বেগ—যদি অবিভক্ত বাংলা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে যায়, তাহলে হিন্দু জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে?
এই উদ্বেগের রাজনৈতিক উত্তর তিনি দিয়েছিলেন বাংলাভাগের ধারণার দিকে এগিয়ে গিয়ে।
অর্থাৎ একই সময়ে দুটি বিপরীত নিরাপত্তা-রাজনীতি তৈরি হচ্ছিল।
মুসলিম লীগের ভাষায়—
মুসলমানদের নিরাপত্তার জন্য পাকিস্তান দরকার।
হিন্দু মহাসভার ভাষায়—
হিন্দুদের নিরাপত্তার জন্য বাংলার বিভাজন দরকার।
এই দুই যুক্তি পরস্পরকে দুর্বল করেনি; বরং একে অপরকে শক্তিশালী করেছে।
এটাই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সবচেয়ে ভয়ংকর বৈশিষ্ট্য।
এক পক্ষের নিরাপত্তা-দাবি অন্য পক্ষের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে; সেই নিরাপত্তাহীনতা আবার পাল্টা রাজনৈতিক সংগঠনকে শক্তিশালী করে; সেই সংগঠনের উত্থান প্রথম পক্ষের ভয় বাড়ায়।
এভাবে একটি fear cycle তৈরি হয়।
১৯৪৬-এর আগে বাংলায় এই চক্র দ্রুত ঘনীভূত হচ্ছিল।
এর মধ্যে আরও একটি বিষয় যুক্ত হয়েছিল—কলকাতা।
কলকাতা ছিল বাংলার রাজধানী, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং সাম্রাজ্যিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর। শহরের জনসংখ্যার ধর্মীয় কাঠামো পূর্ববঙ্গের গ্রামাঞ্চলের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।
ফলে বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভূগোলের মধ্যে একটি মৌলিক অমিল ছিল।
একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশের রাজধানী ছিল এমন একটি শহর যেখানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়।
এই বাস্তবতা রাজনৈতিক উত্তেজনার জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
মুসলিম লীগের কাছে কলকাতা ছিল বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হৃদয়।
হিন্দু মধ্যবিত্তের কাছে কলকাতা ছিল তাদের দীর্ঘ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কেন্দ্র।
দুই পক্ষের কাছে শহরটির অর্থ আলাদা।
আর ১৯৪৬-এর আগস্টে যখন রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের জন্য Direct Action Day ঘোষণা করা হলো, তখন এই শহরই হয়ে উঠল সংঘর্ষের মঞ্চ।
কিন্তু এখনও আমরা ১৬ আগস্টে পৌঁছাইনি।
কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখনও বাকি ছিল।
১৯৩৭-এর পর থেকে ১৯৪৬-এর নির্বাচনের মধ্যবর্তী নয় বছরে মুসলিম লীগ কীভাবে বাংলার মুসলিম রাজনীতির প্রধান শক্তিতে পরিণত হল?
কীভাবে ফজলুল হকের কৃষকভিত্তিক রাজনীতির জায়গা সংকুচিত হল?
কীভাবে পাকিস্তানের ধারণা গ্রামবাংলার রাজনৈতিক কল্পনার অংশ হয়ে উঠল?
কংগ্রেস কেন বাংলায় মুসলিম জনসমাজের মধ্যে তার শক্তি বিস্তার করতে পারল না?
হিন্দু মধ্যবিত্তের একাংশ কেন ক্রমশ কংগ্রেসের বাইরে আরও কঠোর রাজনৈতিক অবস্থানের দিকে গেল?
আর ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের পর প্রশাসন ও সমাজের যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তা কীভাবে ১৯৪৬-এর রাজনৈতিক বিস্ফোরণের পরিবেশ তৈরি করল?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর ছাড়া ১৬ আগস্টকে বিচার করা অন্যায় হবে।
কারণ রাস্তায় যে মানুষটি অস্ত্র হাতে নেমেছিল, তার হাতে অস্ত্র আসার বহু আগেই তার মনের ভিতর একটি রাজনৈতিক মানচিত্র আঁকা হয়ে গিয়েছিল।

অধ্যায় তিন

কৃষকের বাংলা থেকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাংলায়.....

১৯৩৭ সালের বাংলা ছিল এমন এক প্রদেশ, যেখানে রাজনীতির ভাষা এখনও পুরোপুরি সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠেনি।
ধর্ম ছিল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ধর্মই রাজনীতির একমাত্র পরিচয় ছিল না।
কৃষকের জমি, খাজনা, ঋণ, জমিদারের ক্ষমতা, শিক্ষা, চাকরি, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন—এসব প্রশ্নও রাজনৈতিক জীবনের কেন্দ্রে ছিল।
আর এই কারণেই ১৯৩৭-এর বাংলাকে ১৯৪৬-এর বাংলা থেকে আলাদা করে দেখা দরকার।
১৯৩৭-এর নির্বাচনে কোনো দলই ২৫০ সদস্যের বঙ্গীয় আইনসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। কংগ্রেস ছিল বৃহত্তম একক দল, কিন্তু সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তার ছিল না।
এ. কে. ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি এবং মুসলিম লীগ—দুই দলই গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উঠে আসে। শেষ পর্যন্ত ফজলুল হক লীগ ও অন্যান্য গোষ্ঠীর সমর্থনে সরকার গঠন করেন।
এই ঘটনাটির গুরুত্ব কেবল এতটুকু নয় যে ফজলুল হক প্রধানমন্ত্রী হলেন।
এর গভীরতর অর্থ ছিল—বাংলার মুসলমান কৃষকের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা তখনও সরাসরি সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের হাতে সম্পূর্ণভাবে বন্দী হয়নি।
ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল মূলত বাংলার গ্রামীণ সমাজ। তার রাজনীতিতে জমিদারি ও কৃষক-প্রজার সম্পর্ক ছিল একটি কেন্দ্রীয় বিষয়।
অর্থাৎ মুসলমান কৃষককে কেবল ‘মুসলমান’ হিসেবে নয়, ‘কৃষক’ হিসেবেও সংগঠিত করার সম্ভাবনা তখন বাস্তব ছিল।
এখানে ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা আমরা দেখতে পাই।
যদি বাংলার রাজনীতি কৃষক বনাম জমিদার, দরিদ্র বনাম ধনী, গ্রাম বনাম শহর এবং শোষিত বনাম ক্ষমতাবান—এই সামাজিক রেখায় আরও শক্তিশালীভাবে সংগঠিত হতে পারত, তাহলে ধর্মীয় পরিচয় হয়তো রাজনৈতিক সংগঠনের প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠত না।
কিন্তু ইতিহাস সেই পথে যায়নি।
কেন?
কারণ শ্রেণির রাজনীতি এবং সম্প্রদায়ের রাজনীতি একে অপরকে সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন করে না।
একজন দরিদ্র মুসলমান কৃষক একই সঙ্গে কৃষক এবং মুসলমান। তার জমির সমস্যা যেমন বাস্তব, তেমনই তার ধর্মীয় পরিচয়ও তার সামাজিক জীবনের বাস্তব অংশ।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি তার অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয়, তখন তার সম্প্রদায়গত পরিচয় আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক আশ্রয়ে পরিণত হতে পারে।
ফজলুল হকের রাজনৈতিক দুর্বলতা এবং মুসলিম লীগের সংগঠন বিস্তার এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
১৯৩৭-এর পর মুসলিম লীগ বাংলার গ্রামাঞ্চলে সংগঠন বিস্তারে বিশেষ মনোযোগ দেয়। ১৯৩৭ সালের নভেম্বর থেকেই বাংলায় লীগের grassroots সংগঠন শক্তিশালী করার কাজ শুরু হয় এবং ১৯৪৩-এর মধ্যে কৃষক প্রজা পার্টি কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে।
১৯৪৬-এর নির্বাচনে KPP মাত্র কয়েকটি আসন পায়, যেখানে লীগ ১১৪টি আসন অর্জন করে।
এটি নিছক দলবদলের ইতিহাস নয়।
এটি বাংলার রাজনীতির চরিত্র পরিবর্তনের ইতিহাস।
ফজলুল হকের কৃষক-ভিত্তিক আঞ্চলিক রাজনীতির জায়গায় মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় মুসলিম পরিচয় ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠল।
কিন্তু কেন?
একটি কারণ ছিল সংগঠন।
আরেকটি ছিল রাজনৈতিক ভাষা।
ফজলুল হক বলতে পারতেন—কৃষকের অধিকার, জমিদারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, বাংলার স্বায়ত্তশাসন।
মুসলিম লীগ ক্রমশ বলতে শুরু করল—মুসলমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম প্রদেশের অধিকার, মুসলমানদের জন্য পৃথক রাজনৈতিক নিরাপত্তা এবং পাকিস্তান।
দ্বিতীয় ভাষাটি একটি বৃহত্তর ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কল্পনা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল।
একজন পূর্ববঙ্গের কৃষক এবং একজন কলকাতার মুসলিম মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক স্বার্থ এক নয়।
কিন্তু দুজনকেই ‘মুসলমান জাতির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ’-এর একটি বৃহৎ ধারণার মধ্যে যুক্ত করা সম্ভব।
রাজনীতির এই ক্ষমতাই মুসলিম লীগের উত্থানের অন্যতম কারণ।
এখানে জিন্নাহর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি ভারতীয় মুসলমানদের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও শ্রেণিগত স্বার্থকে একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দর-কষাকষির শক্তিতে পরিণত করতে চেয়েছিলেন।
তাঁর রাজনৈতিক সাফল্য ছিল—মুসলিম লীগের পক্ষে এমন একটি দাবি প্রতিষ্ঠা করা যে, ব্রিটিশ ভারত থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় মুসলমানদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে লীগকে পাশ কাটানো যাবে না।
কিন্তু বাংলায় জিন্নাহর এই রাজনীতির সঙ্গে একটি সমস্যা ছিল।
বাংলার মুসলমানরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ।
তাই তাদের রাজনৈতিক সমস্যা উত্তরপ্রদেশের মুসলমানদের সমস্যার মতো ছিল না।
উত্তরপ্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যালঘু; বাংলায় তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জিন্নাহর ‘সংখ্যালঘু নিরাপত্তা’ যুক্তি বাংলায় এসে একটি অন্য রূপ পায়—মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা রক্ষা।
অর্থাৎ বাংলার মুসলমানের কাছে পাকিস্তানের অর্থ অনেকাংশে ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ভবিষ্যতের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় সুরক্ষিত করা।
কিন্তু এখানেই হিন্দু সমাজের মধ্যে ভয়ের জন্ম হয়।
কারণ কলকাতা ও পশ্চিম বাংলার বহু হিন্দুর কাছে প্রশ্নটি ছিল—
যদি বাংলা একটি মুসলিম রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে যায়, তবে তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী?
এই ভয়কে কেবল ‘হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আবার এই ভয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সমস্ত রাজনৈতিক প্রচারও যে বাস্তবতার নিরপেক্ষ প্রতিফলন ছিল, তা বলা যায় না।
ভয় বাস্তব হতে পারে।
কিন্তু ভয়ের রাজনৈতিক ব্যবহার আলাদা বিষয়।
এই পার্থক্যটি আমাদের পুরো বইয়ের একটি কেন্দ্রীয় নীতি হওয়া উচিত।
একটি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাহীনতা সত্য হতে পারে; কিন্তু সেই নিরাপত্তাহীনতার ভিত্তিতে অন্য সম্প্রদায় সম্পর্কে যে সাধারণীকরণ তৈরি হয়, তা সত্য নাও হতে পারে।
১৯৪০-এর দশকে এই সীমারেখাটি ক্রমশ মুছে যাচ্ছিল।
তারপর এল যুদ্ধ।
১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাংলার অর্থনীতি গভীরভাবে পরিবর্তিত হয়। কলকাতা যুদ্ধ-সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে খাদ্য, পরিবহন ও বাজারব্যবস্থার উপর চাপ বাড়ে।
১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ তাই এই গ্রন্থে একটি আলাদা মানবিক বিপর্যয় হিসেবে নয়, বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি কেন্দ্রীয় বাঁক হিসেবে বিবেচিত হবে।
দুর্ভিক্ষে কত মানুষ মারা গিয়েছিল—এই সংখ্যাটি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে হিসাবের পার্থক্য আছে; কিন্তু কয়েক মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু ও বাস্তুচ্যুতি যে বাংলার সমাজকে গভীরভাবে ভেঙে দিয়েছিল, তা নিয়ে কোনো গুরুতর বিতর্ক নেই।
কিন্তু দুর্ভিক্ষের রাজনৈতিক ইতিহাস আরও কঠিন।
ক্ষুধার সময় মানুষ খাদ্যের জন্য রাষ্ট্রের দিকে তাকায়।
রাষ্ট্র যদি ব্যর্থ হয়, মানুষ প্রশ্ন করে—
কারা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করছে?
কারা চাল পাচ্ছে?
কারা পাচ্ছে না?
কারা ব্যবসা করছে?
কারা সরকারি পদে আছে?
কারা ত্রাণ দিচ্ছে?
আর এই প্রশ্নগুলির উত্তর যদি ধর্মীয় পরিচয়ের ভাষায় দেওয়া শুরু হয়, তাহলে অর্থনৈতিক বিপর্যয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির খাদ্যে পরিণত হয়।
দুর্ভিক্ষের সময় ঠিক এমনটাই ঘটেছিল।
তবে এখানে খুব সাবধানে চলতে হবে।
দুর্ভিক্ষ ‘হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা’ সৃষ্টি করেনি।
দুর্ভিক্ষের প্রধান শিকার ছিলেন সাধারণ মানুষ—হিন্দু, মুসলমান, দলিত, দরিদ্র, ভূমিহীন, শ্রমিক—বিভিন্ন পরিচয়ের মানুষ।
কিন্তু দুর্ভিক্ষের পরে রাজনৈতিক সমাজ যখন খাদ্য, ত্রাণ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার ব্যাখ্যা খুঁজতে শুরু করল, তখন সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যা ক্রমশ জায়গা পেল।
এই জায়গাটিই ১৯৪৬ বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ক্ষুধা মানুষের মধ্যে যে হতাশা তৈরি করে, রাজনৈতিক প্রচার তাকে একটি ‘অপরাধী’ বা ‘অপর’ খুঁজে দিতে পারে।
দুর্ভিক্ষের সময় হিন্দু মহাসভার রাজনৈতিক কার্যকলাপের উপর গবেষণা দেখায় যে সংগঠনটি ত্রাণকার্য ও খাদ্যবণ্টনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছিল এবং মুসলিম লীগ পরিচালিত প্রশাসনকে খাদ্যসংকটের জন্য দায়ী করার প্রচার চালিয়েছিল।
এই তথ্য আমাদের একটি অস্বস্তিকর সত্যের সামনে দাঁড় করায়।
সাম্প্রদায়িকতা শুধু সভায় বক্তৃতা দিয়ে তৈরি হয় না।
কখনও কখনও তা তৈরি হয় ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেও, যদি সেই সাহায্যকে একটি সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
এখানে আবার মুসলিম লীগের দিকটিও একই কঠোরতার সঙ্গে বিচার করতে হবে।
দুর্ভিক্ষের সময় মুসলিম লীগ-সমর্থিত রাজনৈতিক শক্তিরাও প্রশাসনিক সাফল্য বা ব্যর্থতাকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহার করেছে।
এদিকে ১৯৪১ সালে ফজলুল হকের মুসলিম লীগ-সমর্থিত রাজনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে যায় এবং তিনি একটি Progressive Coalition গঠন করেন, যেখানে কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা ও কৃষক প্রজা পার্টির বিভিন্ন অংশও যুক্ত হয়।
১৯৪৩ সালে তাঁর মন্ত্রিসভার পতনের পর খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বে নতুন মুসলিম লীগ সরকার আসে।
এই পরিবর্তনের রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর।
ফজলুল হক ছিলেন আঞ্চলিক রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রতীক।
নাজিমুদ্দিন ছিলেন মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধি।
অর্থাৎ ১৯৪৩-এর মধ্যে বাংলার মুসলিম রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন ঘটে।
আঞ্চলিক কৃষক রাজনীতির জায়গায় সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনৈতিক পরিচয় শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
কিন্তু নাজিমুদ্দিন সরকারও স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতি তৈরি করতে পারেনি।
১৯৪৫ সালের মার্চে তাঁর সরকার আইনসভায় কৃষি বাজেট পাস করাতে ব্যর্থ হয় এবং গভর্নর আবার প্রত্যক্ষ প্রশাসন গ্রহণ করেন।
এর পরে নির্বাচন হয় ১৯৪৬-এ।
এই সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখায়।
বাংলায় সরকার পরিচালনার প্রশ্নটি কেবল হিন্দু-মুসলমানের সংখ্যার প্রশ্ন ছিল না; আইনসভায় নানা স্বাধীন সদস্য, ইউরোপীয় সদস্য, তফসিলি জাতির প্রতিনিধি, আঞ্চলিক দল—সব মিলিয়ে ক্ষমতার সমীকরণ অত্যন্ত জটিল ছিল।
কিন্তু ১৯৪৬-এর নির্বাচনে এই জটিলতার অনেকটাই বদলে যায়।
মুসলিম-নির্দিষ্ট আসনে মুসলিম লীগের ব্যাপক সাফল্য তাকে বাংলার মুসলিম রাজনীতির প্রধান শক্তিতে পরিণত করে।
২৫০ আসনের আইনসভায় লীগ ১১৪টি আসন পেয়ে বৃহত্তম দল হয় এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাসে সরকার গঠন করেন।
এখন বাংলার রাজনীতিতে নতুন এক সমীকরণ তৈরি হল।
মুসলিম লীগ শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়—এখন সে প্রাদেশিক সরকারের শাসক।
আর সেই সরকার এমন সময় ক্ষমতায় এল যখন ভারতীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন চূড়ান্ত পর্যায়ে, পাকিস্তানের দাবি সর্বোচ্চ তীব্রতায়, কংগ্রেস ও লীগের সম্পর্ক গভীর অবিশ্বাসে পূর্ণ এবং কলকাতা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে উত্তেজিত।
এই অবস্থায় সোহরাওয়ার্দীর সামনে ইতিহাসের এক কঠিন দায়িত্ব ছিল।
তাঁকে প্রমাণ করতে হত যে মুসলিম লীগ শুধু মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার দাবি করতে পারে না, একটি বহুধর্মীয় প্রদেশও শাসন করতে পারে।
অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীরা অপেক্ষা করছিলেন—কখন প্রমাণ করা যাবে যে লীগ সরকার আসলে সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতদুষ্ট?
এই পারস্পরিক সন্দেহের মধ্যে প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অর্থ পেতে শুরু করল।
এবং এখানেই আমরা ১৯৪৬-এর সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করছি।
কারণ একটি গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে আইনশৃঙ্খলা কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; রাজনৈতিক বৈধতারও পরীক্ষা।
যদি সরকার একটি সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, সেই ব্যর্থতা কেবল পুলিশি ব্যর্থতা থাকে না—তা রাজনৈতিক বিশ্বাসের সংকটে পরিণত হয়।
আর যদি কোনো বিরোধী দল সেই ব্যর্থতাকে পুরো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগে পরিণত করে, তবে প্রশাসনিক ব্যর্থতা সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাসে রূপ নেয়।
১৯৪৬-এর কলকাতায় ঠিক এই বিপজ্জনক সমীকরণটি তৈরি হচ্ছিল।
এখন আমরা বুঝতে পারছি, ১৬ আগস্টের আগের কলকাতা আসলে একটি বিস্ফোরণ-প্রবণ সমাজ।
কিন্তু এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর বাকি—
এই পরিস্থিতিতে মুসলিম লীগের নেতৃত্ব কী চেয়েছিল?
কংগ্রেস কী চেয়েছিল?
সোহরাওয়ার্দী কী চেয়েছিলেন?
শ্যামাপ্রসাদ কী চেয়েছিলেন?
আর ব্রিটিশ প্রশাসন ঠিক কী করছিল?
কারণ দাঙ্গা কোনো ‘স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ’ হিসেবে আকাশ থেকে নেমে আসেনি।
তার আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
সভা ডাকা হয়েছিল।
রাজনৈতিক ভাষা বেছে নেওয়া হয়েছিল।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
আর সেই সিদ্ধান্তগুলির মধ্যেই ১৬ আগস্টের ভবিষ্যৎ আংশিকভাবে লেখা হয়ে গিয়েছিল।


অধ্যায় চার
ক্যাবিনেট মিশনের ব্যর্থতা :


সাংবিধানিক সমঝোতা থেকে প্রত্যক্ষ সংঘাতের পথে
১৯৪৬-এর বাংলায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার যে সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, তার পরবর্তী বিস্ফোরণকে বুঝতে হলে আমাদের আবার সর্বভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরতে হবে।
কারণ কলকাতার রাস্তায় রক্তপাতের আগে দিল্লি ও শিমলার বৈঠককক্ষে একটি অন্য ধরনের যুদ্ধ চলছিল।
সেটি ছিল সাংবিধানিক যুদ্ধ।
প্রশ্ন ছিল—ব্রিটিশরা চলে গেলে ভারত কেমন রাষ্ট্র হবে?
একটি ভারত?
নাকি দুটি?
আর যদি একটি ভারত হয়, তবে কেন্দ্র কতটা শক্তিশালী হবে?
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলির ক্ষমতা কতটা থাকবে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতেই ১৯৪৬ সালের মার্চে ভারতে আসে Cabinet Mission।
লর্ড পেথিক-লরেন্স, স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস এবং এ. ভি. আলেকজান্ডার—এই তিন ব্রিটিশ মন্ত্রী ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শুরু করেন।
ব্রিটিশ সরকারের কাছে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কঠিন।
একদিকে ভারতীয় স্বাধীনতার দাবি আর অস্বীকার করা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবি ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে।
আবার কংগ্রেস ভারতকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করার ধারণা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।
ব্রিটিশরা বুঝেছিল—ভারতকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার আগে যদি কোনো সাংবিধানিক সমঝোতা তৈরি না হয়, তাহলে ক্ষমতা হস্তান্তর রক্তক্ষয়ী হতে পারে।
Cabinet Mission Plan সেই বিপদ এড়ানোর শেষ বড় প্রচেষ্টা।
প্রস্তাবটির মূল ধারণা ছিল একটি ভারতীয় Union থাকবে, কিন্তু কেন্দ্রের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত হবে। প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র এবং যোগাযোগের মতো কয়েকটি বিষয় কেন্দ্রে থাকবে; বাকি অধিকাংশ ক্ষমতা থাকবে প্রদেশের হাতে।
এর পাশাপাশি প্রদেশগুলিকে তিনটি গ্রুপে সংগঠিত করার পরিকল্পনা করা হয়।
Group A-তে ছিল প্রধানত হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলি।
Group B-তে ছিল উত্তর-পশ্চিমের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলি।
Group C-তে ছিল বাংলা ও আসাম।
এই কাঠামোর মধ্যে একটি অদ্ভুত ভারসাম্য ছিল।
ভারত ভাঙছে না।
কিন্তু ভারত একেবারে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রও হচ্ছে না।
মুসলিম লীগ এতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলির জন্য একটি রাজনৈতিক নিরাপত্তার কাঠামো দেখতে পেল।
কংগ্রেস এতে ভারতের ঐক্য রক্ষার সম্ভাবনা দেখতে পেল।
কিছু সময়ের জন্য মনে হল—সম্ভবত সমঝোতা সম্ভব।
কিন্তু এই সম্ভাবনার ভিতরেই ছিল ভবিষ্যৎ সংঘাতের বীজ।
কারণ একই পরিকল্পনাকে দুই পক্ষ দুইভাবে পড়ছিল।
মুসলিম লীগের কাছে প্রাদেশিক গ্রুপিং ছিল পরিকল্পনার অপরিহার্য অংশ।
কংগ্রেসের কাছে প্রদেশগুলির গ্রুপিং ছিল বাধ্যতামূলক রাজনৈতিক কাঠামো নয়; ভবিষ্যৎ গণপরিষদে ভারতীয় জনগণের প্রতিনিধিরা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রকৃতি নির্ধারণ করতে পারবেন—এই স্বাধীনতা তারা বজায় রাখতে চেয়েছিল।
অর্থাৎ কাগজে একটি পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু পরিকল্পনার ভবিষ্যৎ অর্থ নিয়ে দুই পক্ষের ধারণা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
এখানেই জওহরলাল নেহরুর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নেহরু বিশ্বাস করতেন, স্বাধীন ভারতকে আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, শিল্পায়ন, প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ এবং সর্বভারতীয় উন্নয়নের জন্য দুর্বল কেন্দ্র তাঁর কাছে কার্যকর রাষ্ট্রের পরিপন্থী।
জিন্নাহর আশঙ্কা ছিল ঠিক উল্টো।
তিনি মনে করতেন, শক্তিশালী কেন্দ্র মানে এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের হাতে স্থায়ী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে পারে।
এই দুই আশঙ্কার মধ্যে কোনোটি নিছক কল্পনা ছিল না।
ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠতা-সংখ্যালঘুতার বাস্তবতা দুই পক্ষকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন করেছিল।
গান্ধী এই বিতর্ককে কিছুটা অন্যভাবে দেখছিলেন।
তাঁর কাছে ভারতীয় ঐক্য ছিল রাজনৈতিক হিসাবের চেয়েও গভীর একটি নৈতিক ধারণা।
তিনি বিশ্বাস করতেন, ভারতকে শুধু সংবিধানের মাধ্যমে এক রাখা যাবে না; মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে হবে।
কিন্তু ১৯৪৬-এর রাজনীতি তখন নৈতিক আস্থার চেয়ে সাংবিধানিক ক্ষমতার হিসাবেই বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল।
ক্যাবিনেট মিশনের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষই কোনো না কোনোভাবে গ্রহণ করেছিল।
কিন্তু গ্রহণের অর্থ এক ছিল না।
এই পার্থক্য দ্রুত প্রকট হয়ে ওঠে।
কংগ্রেসের সভাপতিত্বে নেহরু জুলাই ১৯৪৬-এ এমন মন্তব্য করেন, যার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা মুসলিম লীগের কাছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। তিনি ইঙ্গিত দেন যে গণপরিষদে কংগ্রেস কোনো পূর্বনির্ধারিত সাংবিধানিক কাঠামোর কাছে চিরস্থায়ীভাবে আবদ্ধ থাকবে না।
জিন্নাহর কাছে এর অর্থ ছিল স্পষ্ট—
যে পরিকল্পনাকে মুসলিম লীগ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলির নিরাপত্তার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে, কংগ্রেস ক্ষমতায় গেলে সেটিকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করতে পারে।
অবিশ্বাস আরও গভীর হল।
২৯ জুলাই ১৯৪৬ বোম্বাইয়ে মুসলিম লীগের কাউন্সিল Cabinet Mission Plan-এর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে।
এবং সেখানেই ভারতীয় রাজনীতির ভাষায় একটি নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে।
মুসলিম লীগ ঘোষণা করে—
Direct Action।
পাকিস্তান অর্জনের জন্য সাংবিধানিক পথ ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের পথ নেওয়া হবে।
১৬ আগস্ট ১৯৪৬ নির্ধারিত হয় Direct Action Day হিসেবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠবে—
Direct Action-এর অর্থ কী ছিল?
মুসলিম লীগের রাজনৈতিক ভাষ্যে এটি ছিল পাকিস্তানের দাবিকে বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করার কর্মসূচি।
এটি ঘোষণার সময় আনুষ্ঠানিকভাবে হত্যাকাণ্ড বা দাঙ্গাকে লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।
কিন্তু ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির বিচার শুধু তার ঘোষিত উদ্দেশ্য দিয়ে হয় না।
তার বাস্তব পরিবেশও বিবেচনা করতে হয়।
১৯৪৬-এর কলকাতা ছিল ইতিমধ্যেই উত্তেজনায় পূর্ণ।
মুসলিম লীগ সরকার ক্ষমতায়।
কংগ্রেস ও লীগ পরস্পরের প্রতি গভীর অবিশ্বাসে আক্রান্ত।
হিন্দু-মুসলমানের রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র।
দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা প্রবল।
শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক সংগঠনগুলির প্রভাব শক্তিশালী।
এই পরিস্থিতিতে একটি বিশাল ধর্মঘট ও রাজনৈতিক সমাবেশের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এই প্রশ্ন শুধু মুসলিম লীগের ক্ষেত্রেই নয়।
প্রশাসনের ক্ষেত্রেও।
বাংলার সরকার কেন এত বড় একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিকে এমনভাবে পরিচালনা করল যাতে সংঘর্ষের সম্ভাবনা কমানো যায় না?
ব্রিটিশ প্রশাসন কেন আগাম যথেষ্ট শক্তি মোতায়েন করল না?
কংগ্রেস ও হিন্দু রাজনৈতিক সংগঠনগুলি কেন এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক পাল্টা সংগঠনের পথ নিল?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর পরবর্তী অধ্যায়ের কেন্দ্রে থাকবে।
কিন্তু চতুর্থ অধ্যায়ের এই পর্যায়ে একটি বিষয় পরিষ্কার—
১৬ আগস্টের দাঙ্গা কোনো শূন্যস্থান থেকে জন্ম নেয়নি।
তার ঠিক আগে একটি সাংবিধানিক সমঝোতা ভেঙে পড়েছিল।
একটি রাজনৈতিক দল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে সাংবিধানিক পথ যথেষ্ট নয়।
অন্যদিকে কংগ্রেসও এমন কোনো সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দিতে পারেনি যা মুসলিম লীগের ভবিষ্যৎ-ভয়কে সম্পূর্ণ দূর করতে পারত।
ব্রিটিশ সরকারও ভারতীয় নেতৃত্বের মধ্যে স্থায়ী সমঝোতা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছিল।
অর্থাৎ ১৯৪৬-এর সংকটের কেন্দ্রে ছিল একটি মৌলিক প্রশ্ন—
কে কাকে বিশ্বাস করবে?
মুসলিম লীগ কংগ্রেসকে বিশ্বাস করছিল না।
কংগ্রেস মুসলিম লীগকে বিশ্বাস করছিল না।
ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলি ব্রিটিশ প্রশাসনকে বিশ্বাস করছিল না।
আর ব্রিটিশ প্রশাসনও ভারতীয় দলগুলির মধ্যে স্থায়ী সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে ক্রমশ আশাহীন হয়ে পড়ছিল।
বিশ্বাসের এই ভাঙনই রাজনৈতিক সংকটকে বিপজ্জনক করে তোলে।
কারণ গণতন্ত্র শুধু ভোটের উপর দাঁড়ায় না।
গণতন্ত্র দাঁড়ায় পরাজয় মেনে নেওয়ার ক্ষমতার উপর, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তার উপর এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ভবিষ্যৎ অস্তিত্বকে স্বীকার করার উপর।
১৯৪৬-এর ভারত সেই তিন ক্ষেত্রেই সংকটে পড়েছিল।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বাংলার বিশেষ বাস্তবতা।
মুসলিম লীগ এখানে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে।
কিন্তু রাজধানী কলকাতায় হিন্দু জনসংখ্যা সংখ্যাগরিষ্ঠ।
অর্থাৎ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলার রাজনৈতিক সরকারকে শাসন করতে হচ্ছিল হিন্দু-অধ্যুষিত একটি শহরকে।
এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক প্রতীকবাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কলকাতায় Direct Action Day সফল হলে মুসলিম লীগ দেখাতে পারত—তার সংগঠন বাংলায় এবং সর্বভারতীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী।
অন্যদিকে কলকাতার হিন্দু রাজনৈতিক সমাজের একটি অংশ এটিকে দেখছিল তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শন হিসেবে।
ফলে একই মিছিলের অর্থ দুই সম্প্রদায়ের কাছে দুই রকম হয়ে উঠেছিল।
এখানেই রাজনৈতিক প্রতীক বাস্তব বিপদের রূপ নেয়।
আর তখন একটি নতুন প্রশ্ন সামনে আসে—
রাষ্ট্র কী করবে?
সরকার কি রাজনৈতিক কর্মসূচির স্বাধীনতা রক্ষা করবে?
নাকি সম্ভাব্য সংঘর্ষ ঠেকাতে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেবে?
মিছিলের পথ কী হবে?
দোকান বন্ধ হবে কি না?
পুলিশ কোথায় থাকবে?
সেনা কখন নামবে?
রাজনৈতিক নেতারা কীভাবে জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করবেন?
এই প্রশ্নগুলির উত্তরই নির্ধারণ করবে ১৬ আগস্ট কেবল একটি রাজনৈতিক সমাবেশ থাকবে, নাকি কলকাতার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের সূচনা হবে।
এখানে সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি ছিলেন বাংলার প্রধানমন্ত্রী।
তিনি ছিলেন মুসলিম লীগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা।
এবং একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সঙ্গেও তাঁর সরাসরি সম্পর্ক ছিল।
এই দ্বৈত ভূমিকা পরবর্তী সময়ে তাঁকে ঘিরে অসংখ্য অভিযোগ ও বিতর্কের জন্ম দেয়।
কিন্তু ইতিহাসের কাজ অভিযোগকে পুনরাবৃত্তি করা নয়।
ইতিহাসের কাজ হল—
কী ঘটেছিল?
কোন সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল?
কোন তথ্য কার কাছে ছিল?
কোন মুহূর্তে কী করা সম্ভব ছিল?
কোথায় প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছিল?
আর কোথায় জনতার নিজস্ব সিদ্ধান্ত সহিংসতাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর ছাড়া সোহরাওয়ার্দীকে ‘দাঙ্গার নায়ক’ বা ‘দাঙ্গার খলনায়ক’—কোনোটিই বলা যায় না।
একইভাবে জিন্নাহকেও কেবল ‘দাঙ্গার পরিকল্পনাকারী’ বললে তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জটিলতা হারিয়ে যায়।
আবার Direct Action-এর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে তাঁর দায়ের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়াও ইতিহাসের প্রতি অন্যায়।
কারণ নেতৃত্বের দায় শুধু উদ্দেশ্যে নয়; কখনও কখনও পূর্বানুমেয় পরিণতিতেও।
২৯ জুলাইয়ের সিদ্ধান্তের পর ভারতীয় রাজনীতি আর আগের জায়গায় থাকল না।
সাংবিধানিক আলোচনার ভাষা ক্রমশ জনসমাবেশের ভাষায় রূপান্তরিত হল।
আর জনসমাবেশের ভাষা যখন ‘আমরা’ এবং ‘ওরা’-র ভাষায় পরিণত হয়, তখন রাজনীতি খুব সহজেই সংখ্যার খেলায় বদলে যায়।
কত মানুষ আমাদের সঙ্গে?
কত মানুষ ওদের সঙ্গে?
কত এলাকা আমাদের?
কত এলাকা ওদের?
এই প্রশ্নগুলি রাষ্ট্রের নাগরিককে সম্প্রদায়ের সদস্যে পরিণত করে।
১৬ আগস্টের আগে কলকাতা সেই বিপজ্জনক সীমারেখায় এসে দাঁড়িয়েছিল।
পরবর্তী অধ্যায়ে তাই আমাদের আর দিল্লির সাংবিধানিক বিতর্কে থাকা চলবে না।
আমাদের নামতে হবে কলকাতার রাস্তায়।
দেখতে হবে—
১৬ আগস্টের সকাল কীভাবে শুরু হয়েছিল?
কে কোথায় মিছিল করেছিল?
কীভাবে হরতাল সংঘর্ষে পরিণত হল?
পুলিশ কী করেছিল?
সোহরাওয়ার্দী কোথায় ছিলেন?
ব্রিটিশ প্রশাসন কী করছিল?
প্রথম রক্ত কোথায় ঝরেছিল?
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
কীভাবে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল?
এই প্রশ্নের উত্তরেই শুরু হবে কলকাতা দাঙ্গার প্রকৃত ইতিহাস।

অধ্যায় পাঁচ
১৬ আগস্ট ১৯৪৬ : রাষ্ট্র যখন রাস্তায় হারিয়ে গেল


১৬ আগস্ট ১৯৪৬, শুক্রবার।
কলকাতায় সকালটি শুরু হয়েছিল রাজনৈতিক কর্মসূচির দিন হিসেবে; শেষ পর্যন্ত সেটি পরিণত হয়েছিল এমন এক সহিংসতার মধ্যে, যার অভিঘাত শুধু শহরের কয়েকটি মহল্লায় সীমাবদ্ধ থাকেনি—বরং ভারতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎকেই বদলে দিয়েছিল।
এই দিনের ইতিহাস লিখতে গেলে প্রথমেই একটি সতর্কতা প্রয়োজন।
পরবর্তী কয়েক দশকে ১৬ আগস্টকে নিয়ে যে বিপুল রাজনৈতিক সাহিত্য তৈরি হয়েছে, তার অনেকটাই নিজ নিজ সম্প্রদায়ের পক্ষে একটি নির্দিষ্ট ‘দোষী’ নির্মাণ করেছে।
মুসলিম লীগের সমালোচকরা একে পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের ফল হিসেবে দেখেছেন; লীগের সমর্থকেরা কখনও কখনও দাবি করেছেন যে Direct Action ছিল রাজনৈতিক কর্মসূচি, দাঙ্গা তার উদ্দেশ্য ছিল না।
আবার কিছু ইতিহাসবিদ ঘটনাটিকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও নগর-সংকটের মধ্যে দেখেছেন।
সুতরাং আমাদের প্রথম সিদ্ধান্তটি হতে হবে—
১৬ আগস্টের সহিংসতা ব্যাখ্যা করার জন্য একটিমাত্র কারণ যথেষ্ট নয়।
তবে বহু কারণ থাকলেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দায় মুছে যায় না।
২৯ জুলাই মুসলিম লীগের Direct Action-এর সিদ্ধান্ত ছিল একটি বাস্তব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। ১৬ আগস্ট তার জন্য নির্ধারিত দিন।
বাংলায় সেই কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায় এসে পড়েছিল মুসলিম লীগ-নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারের উপর।
আর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন একই সঙ্গে বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্র দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী।
এই ‘দ্বৈত ভূমিকা’ সমকালীন ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছেও উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এখানে থামা দরকার।
কারণ পরবর্তী ইতিহাসে সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে দুটি বিপরীত চিত্র তৈরি হয়েছে।
একটি চিত্রে তিনি দাঙ্গার মূল পরিকল্পনাকারী।
অন্যটিতে তিনি দাঙ্গা ঠেকানোর চেষ্টা করা এক অসহায় প্রশাসক।
দুটির কোনোটিই সরলভাবে গ্রহণ করা যায় না।
নথি বলছে, তিনি পুলিশ সদর দপ্তরের কন্ট্রোল রুমে উপস্থিত ছিলেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিলেন।
আবার তাঁর প্রশাসনিক ভূমিকা, আগাম প্রস্তুতি, পুলিশ ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগও তদন্তের সামনে উঠেছিল।
অর্থাৎ সোহরাওয়ার্দীর উপস্থিতি প্রমাণ করে না যে তিনি দাঙ্গা ঘটাতে চেয়েছিলেন।
আবার কন্ট্রোল রুমে তাঁর উপস্থিতি তাঁকে প্রশাসনিক দায় থেকে মুক্তিও দেয় না।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন শাসকের অপরাধ প্রমাণ করতে হলে ‘তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন’ যথেষ্ট নয়; কিন্তু তাঁর অধীনে প্রশাসন কেন ব্যর্থ হল—সেই প্রশ্ন অবশ্যই করা যায়।
১৬ আগস্টের আগের দিনগুলিতেই উত্তেজনা ছিল স্পষ্ট।
কলকাতা জেলা মুসলিম লীগের ঘোষিত কর্মসূচিতে পূর্ণ হরতাল ও সাধারণ ধর্মঘটের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল ও কাফেলা বেরিয়ে Ochterlony Monument-এর দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
এখানে একটি প্রশাসনিক প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে—
এত বড় রাজনৈতিক সমাবেশের সঙ্গে সংঘর্ষের সম্ভাবনা কি প্রশাসন বুঝতে পারেনি?
বাস্তবে ১৬ আগস্ট সকাল দশটার আগেই পুলিশ সদর দপ্তরে শহরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উত্তেজনা, দোকান বন্ধ করতে বাধ্য করা, ছুরি-আক্রমণ এবং ইট-পাটকেল ছোড়ার খবর পৌঁছেছিল বলে গভর্নর বারোজের পরবর্তী রিপোর্টে উল্লেখ আছে।
অর্থাৎ দাঙ্গার সম্ভাবনা একেবারে অদৃশ্য ছিল না।
এটাই প্রশাসনিক ব্যর্থতার আলোচনাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
যদি সকালেই বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংঘর্ষের খবর আসে, তাহলে রাষ্ট্রের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল পরিস্থিতিকে দ্রুত বিচ্ছিন্ন করা—মিছিলের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ, সংবেদনশীল এলাকায় পুলিশ মোতায়েন, যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করা।
কিন্তু কলকাতার পুলিশ-ব্যবস্থা খুব দ্রুতই পরিস্থিতির তুলনায় অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে।
এখানে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের একটি গভীর দুর্বলতা প্রকাশ পায়।
ব্রিটিশ রাষ্ট্র ভারতে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য যে পুলিশ কাঠামো তৈরি করেছিল, তা মূলত জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নির্মিত; একটি বহুমাত্রিক নগর-দাঙ্গায় দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং সর্বত্র কার্যকর নাগরিক সুরক্ষা দেওয়ার জন্য নয়।
রাজনৈতিক মিছিল যখন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কেন্দ্রীয় সমাবেশের দিকে এগোচ্ছিল, শহরের অন্য অংশে দোকানপাট বন্ধ করা নিয়ে সংঘর্ষ শুরু হয়।
যে ব্যবসায়ীরা হরতাল মানতে চাইছিলেন না, তাঁদের সঙ্গে মিছিলকারীদের সংঘর্ষের কথা সরকারি তদন্তের নথিতে এসেছে।
পরবর্তী গবেষণায়ও দেখা যায়, কিছু এলাকায় দোকান লুঠের ঘটনা থেকেই সংঘর্ষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে।
প্রথমে রাজনৈতিক কর্মসূচি।
তারপর হরতাল।
তারপর হরতাল মানা বা না-মানা নিয়ে সংঘর্ষ।
তারপর প্রতিশোধ।
তারপর এলাকা দখল।
তারপর লুঠ।
আর এক পর্যায়ে সহিংসতা নিজেই নিজের গতি তৈরি করে।
এই পর্যায়ে আর কোনো রাজনৈতিক দলের নির্দেশের অপেক্ষা করে না জনতা।
একটি মহল্লায় যা ঘটেছে তার খবর অন্য মহল্লায় পৌঁছে যায়—অনেক সময় সত্যের সঙ্গে গুজব মিশে।
নিহতের সংখ্যা বাড়িয়ে বলা হয়।
নারী অপহরণের কথা ছড়ায়।
ধর্মীয় স্থানে হামলার খবর ছড়ায়।
পরিচিত কারও মৃত্যুর সংবাদ প্রতিশোধের আগুন জ্বালায়।
দাঙ্গার মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক এখানেই।
গুজব কখনও কখনও অস্ত্রের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়।
১৬ আগস্টের কলকাতায় এই গুজব-প্রতিশোধের চক্র দ্রুত বিস্তৃত হয়েছিল।
তবে এখানে ‘দুই পক্ষই সমান’ বলে ইতিহাস শেষ করে দেওয়াও ভুল হবে।
কারণ সহিংসতা কোথায় কীভাবে শুরু হয়েছিল, কোন সংগঠন প্রথম কী ভূমিকা নিয়েছিল, কোন এলাকায় কোন পক্ষের হাতে কতটা সংগঠিত শক্তি ছিল—এসবের নির্দিষ্ট অনুসন্ধান প্রয়োজন।
কিন্তু একই সঙ্গে ‘শুধু এক পক্ষই সব করেছে’—এই সিদ্ধান্তও পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য নয়।
সমকালীন ও পরবর্তী নথি দেখায় যে কয়েক দিনের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই হত্যাকাণ্ড, লুঠ ও অগ্নিসংযোগের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিল।
এখানে ‘দুই পক্ষের সহিংসতা’ কথাটির অর্থ কিন্তু নৈতিক সমতা নয়।
একটি অপরাধ অন্য অপরাধকে বৈধ করে না।
বরং আমাদের প্রত্যেকটি অপরাধের আলাদা রাজনৈতিক ও সামাজিক উৎস খুঁজতে হবে।
এই পর্যায়ে কলকাতার ভূগোল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শহরের বিভিন্ন অঞ্চল ধর্মীয় ও শ্রেণিগতভাবে একরকম ছিল না। ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি, শ্রমিক এলাকা, বাণিজ্যিক অঞ্চল, মধ্যবিত্ত পাড়া এবং ইউরোপীয় ব্যবসায়িক অঞ্চল—প্রতিটির সামাজিক চরিত্র আলাদা।
ফলে দাঙ্গার অভিঘাতও একরকম ছিল না।
একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে পুলিশ প্রথমদিকে কেন্দ্রীয় ব্যবসায়িক এলাকার ইউরোপীয় সম্পত্তি রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল।
পরে জীবন ও সম্পত্তি রক্ষার বৃহত্তর সংকট সামনে আসে।
এই তথ্য ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে একটি কঠিন প্রশ্ন তোলে।
ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছে কি তখনও ‘রাষ্ট্রের সম্পত্তি’ এবং ‘নাগরিকের জীবন’ সমান গুরুত্ব বহন করছিল?
যদি না করে থাকে, তবে স্বাধীনতার প্রাক্কালে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতা কতটা অবশিষ্ট ছিল?
এখানে আমরা ১৯৪৬-এর রাজনৈতিক সংকটের আরও গভীরে পৌঁছাই।
ব্রিটিশরা ভারত ছাড়তে চলেছে।
কিন্তু তারা এখনও রাষ্ট্রযন্ত্রের মালিক।
ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলি ক্ষমতার জন্য সংগ্রাম করছে।
কিন্তু তাদের হাতে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রক্ষমতা নেই।
এই অর্ধেক-ক্ষমতা, অর্ধেক-প্রস্থান পরিস্থিতি প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল।
গভর্নর বারোজ তাঁর ২২ আগস্টের রিপোর্টে লিখেছিলেন—ব্রিটিশ কর্তৃত্বের দুর্বলতা, যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষে কলকাতার স্বাভাবিক জীবনযাত্রার বিপর্যয় এবং মুসলিম মন্ত্রিসভার অধীনে প্রধানত হিন্দু-অধ্যুষিত কলকাতার রাজনৈতিক অবস্থান ছিল দাঙ্গার দীর্ঘমেয়াদি পটভূমির অংশ।
তাঁর মতে, Direct Action-এর সিদ্ধান্ত ছিল তাৎক্ষণিক কারণ।
এই মূল্যায়ন আমাদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো দেয়।
দীর্ঘমেয়াদি কারণ ছিল বহুস্তরীয়।
তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ট্রিগার ছিল Direct Action Day।
কিন্তু দাঙ্গার ব্যাপ্তি নির্ধারণ করেছিল প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়া।
এই তিনটিকে আলাদা না করলে ইতিহাস বিকৃত হয়।
এখন প্রশ্ন—সোহরাওয়ার্দী কি ইচ্ছাকৃতভাবে পুলিশকে নিষ্ক্রিয় রেখেছিলেন?
এই অভিযোগ ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশগুলির একটি।
কিছু সমকালীন ও পরবর্তী বর্ণনায় তাঁকে দাঙ্গার জন্য সরাসরি দায়ী করা হয়েছে।
আবার তাঁর উপস্থিতি এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার কথাও নথিতে আছে।
অতএব এই গ্রন্থে আমরা বলব না—
‘সোহরাওয়ার্দী দাঙ্গা ঘটিয়েছিলেন।’
আবার বলব না—
‘সোহরাওয়ার্দীর কোনো দায় ছিল না।’
আমাদের সিদ্ধান্ত হবে আরও কঠিন:
একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি এমন একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রশাসনিক পরিণতি যথেষ্ট কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি—এবং তাঁর একই সঙ্গে দলীয় নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে গভীর সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল।
এটি ব্যক্তিগত অপরাধের রায় নয়; এটি রাজনৈতিক দায়ের মূল্যায়ন।
এবং এই পার্থক্য ইতিহাসের জন্য অপরিহার্য।
কারণ একই মানদণ্ড আমাদের কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে হবে।
যদি কোনো হিন্দু রাজনৈতিক সংগঠন মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভকে সাধারণ মুসলমানের বিরুদ্ধে বিদ্বেষে পরিণত করে থাকে, তবে সেই ভূমিকারও কঠোর সমালোচনা করতে হবে।
যদি কোনো মুসলিম লীগ কর্মী বা স্থানীয় নেতা রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিয়ে থাকে, তার দায়ও স্পষ্ট করতে হবে।
যদি পুলিশ কোনো পক্ষের প্রতি পক্ষপাত দেখিয়ে থাকে, সেটিও রাষ্ট্রের ব্যর্থতা।
আর যদি সাধারণ মানুষ প্রতিবেশীকে ধর্মের কারণে আক্রমণ করে থাকে, তবে সেই অপরাধের দায় রাজনৈতিক নেতার ঘাড়ে পুরোপুরি চাপিয়ে দেওয়াও সঠিক নয়।
কারণ দাঙ্গার ইতিহাসে নেতৃত্ব, সংগঠন, প্রশাসন এবং জনতা—চারটি স্তর আলাদা।
১৬ আগস্টের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সম্ভবত এই যে, এই চারটি স্তরের নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
সন্ধ্যার দিকে কলকাতার বহু অঞ্চল কার্যত নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে।
পরবর্তী দিনগুলিতে সহিংসতা আরও বিস্তৃত হয়। পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
এই বিলম্বের রাজনৈতিক তাৎপর্য বিপুল।
কারণ দাঙ্গায় প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্র যদি প্রথম পর্যায়েই দৃঢ়ভাবে উপস্থিত হয়, অনেক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার আগেই থামানো সম্ভব।
কিন্তু একবার কোনো এলাকা ‘আমাদের’ এবং ‘ওদের’ বলে চিহ্নিত হয়ে গেলে, পুলিশ ঢোকার আগেই জনতা নিজেদের প্রতিরক্ষা ও প্রতিশোধের ব্যবস্থা করতে শুরু করে।
এভাবেই শহর ভেঙে যায় পাড়ায় পাড়ায়।
আর পাড়া যখন রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন নাগরিকত্বের মৃত্যু শুরু হয়।
এই অর্থে ১৬ আগস্টের কলকাতা কেবল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শহর নয়—এটি ছিল রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের পরীক্ষাগার।
রাষ্ট্র সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছিল।
কিন্তু ব্যর্থতার কারণ শুধু সোহরাওয়ার্দী নন।
শুধু মুসলিম লীগ নন।
শুধু কংগ্রেস নন।
শুধু হিন্দু মহাসভা নন।
শুধু ব্রিটিশ নন।
বরং ১৯৪৬-এর ভারতীয় রাজনীতির বহু বছরের ব্যর্থতা সেই মুহূর্তে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে এসে মিলিত হয়েছিল।
আর তার মূল্য দিয়েছিল সাধারণ মানুষ।
এই হত্যাকাণ্ডের পর কলকাতার রাজনীতি আর আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি।
মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবি নতুন আবেগ পেল।
হিন্দু সমাজের একাংশের মধ্যে বাংলাভাগের দাবি শক্তিশালী হল।
কংগ্রেসের কাছে লীগকে নিয়ে অবিশ্বাস আরও গভীর হল।
ব্রিটিশদের কাছে ভারতীয় নেতাদের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে উঠল।
এবং সবচেয়ে ভয়ংকরভাবে—কলকাতার রক্তের খবর বাংলার গ্রামাঞ্চলে পৌঁছতে শুরু করল।
সেখানেই পরবর্তী অধ্যায়ের সূচনা।
কলকাতার দাঙ্গা শুধু কলকাতায় থাকেনি।
তার প্রতিক্রিয়া পৌঁছেছিল নোয়াখালিতে।
আর নোয়াখালির ঘটনায় আবার অন্য ধরনের সামাজিক বাস্তবতা সামনে আসে—গ্রামীণ ক্ষমতার কাঠামো, জমি, ধর্মীয় পরিচয়, গুজব, প্রতিশোধ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
সেখানে মহাত্মা গান্ধী নিজে উপস্থিত হয়ে যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, সেটিও ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অসাধারণ অধ্যায়।
কলকাতার রক্ত এবার বাংলার গ্রামে পৌঁছাতে চলেছে।